গত এক সপ্তাহের টানা বর্ষণ এবং দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, আবহাওয়ার এই বিরূপ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে এবং ভোক্তাদের বাড়তি মূল্য গুনতে হতে পারে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস, পাইকারি বাজারে লেনদেন এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহন—প্রায় প্রতিটি ধাপই টানা বৃষ্টির কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে আমদানি থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে অতিবৃষ্টির কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে গেছে। সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের ব্যাপক ক্ষতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। মাঠ থেকে শহরের বাজারে পণ্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ায় রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় সবজির দাম ইতোমধ্যেই বাড়তে শুরু করেছে।
এদিকে বন্যাকবলিত মানুষের জন্য ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার হওয়ায় কিছু শুকনো খাদ্যপণ্যের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে চিড়া, মুড়ি, সেমাই, বিস্কুট, নুডলস ও খেজুরের বাজারে। চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব পণ্যের দামও কিছুটা বেড়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, আপাতত অধিকাংশ খাদ্যপণ্যের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। তবে বৃষ্টি ও বন্যার পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হতে পারে এবং তখন বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ বাড়বে।
বাংলাদেশ চিনি, ভোজ্যতেল ও গমের মতো গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপণ্যের জন্য অনেকাংশেই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এসব পণ্য প্রথমে বড় জাহাজে এসে পৌঁছায়, পরে ছোট জাহাজের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। কিন্তু গত এক সপ্তাহে উত্তাল সমুদ্র ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে পণ্য স্থানান্তর কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
বাংলাদেশ কার্গো জাহাজ মালিক সমিতির সভাপতি গাজী বেলায়েত হোসেন জানান, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন যেখানে ৪০ থেকে ৫০টি লাইটার জাহাজে পণ্য ওঠানো হয়, সেখানে গত সপ্তাহে প্রতিদিন মাত্র ৫ থেকে ১০টি জাহাজে এই কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়েছে।
সোমবার সকাল থেকে সমুদ্রের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় পণ্য ওঠানো-নামানো আবার শুরু হয়েছে। তবে এখনও ৪০০টির বেশি লাইটার জাহাজ পণ্য বোঝাইয়ের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে পুরো কার্যক্রম স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ, চাকতাই ও আসাদগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ীরাও জানিয়েছেন, আশপাশের জেলা থেকে ক্রেতারা বাজারে আসতে না পারায় দৈনিক লেনদেন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে শুকনো খাদ্যপণ্যের বাজারে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দামও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমানে ২৫ কেজির এক বস্তা সাধারণ মানের চিড়ার পাইকারি দাম এক সপ্তাহ আগে যেখানে ছিল ১ হাজার ২০০ টাকা, সেখানে এখন তা বেড়ে ১ হাজার ৩০০ টাকায় পৌঁছেছে। প্রতি কেজি মুড়ির দাম বেড়েছে ২ থেকে ৩ টাকা, যা এখন ৬৫ থেকে ৬৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৩০ কেজির এক ঝুড়ি খোলা সেমাইয়ের দাম ৯০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৫০ টাকা। পাশাপাশি প্রতি কেজি খেজুরের দামও ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
ব্যবসায়ীদের ধারণা, এই মূল্যবৃদ্ধি মূলত বন্যা পরিস্থিতির কারণে তৈরি হওয়া সাময়িক চাপের ফল।
ভারী বৃষ্টির কারণে ট্রাকে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজও ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত যানবাহনের সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগের ৪০৮টি ইউনিয়ন বন্যা, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাগড়াছড়ি, যেখানে জেলার প্রায় ৭৩ শতাংশ এলাকা দুর্যোগে আক্রান্ত। এছাড়া চট্টগ্রামের প্রায় ৫০ শতাংশ এবং কক্সবাজারের ৪৯ শতাংশ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাহাড়ি এলাকায় জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের কারণে কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিঘ্নিত হওয়ায় এসব অঞ্চলে পণ্য পরিবহনও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, চাল, ডাল, চিনি ও ভোজ্যতেলের পাইকারি মজুত এখনও সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
রাজধানী ঢাকার পাইকারি বাজারেও একই ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। কারওয়ান বাজারের সবজি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বৃষ্টি ও বন্যার কারণে কৃষকদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সবজি আসছে না। ফলে পাইকারি বাজারে সবজির দাম স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, টানা বৃষ্টির কারণে কৃষকদের ফসল সংগ্রহ এবং বাজারে পৌঁছে দেওয়ার কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে ভোজ্যতেল, চিনি ও আটা সরবরাহেও বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। গত চার থেকে পাঁচ দিন ধরে অনেক কোম্পানি বাজারের বিদ্যমান চাহিদার অর্ধেকও পূরণ করতে পারছে না।
পাইকারি পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধি সীমিত থাকলেও পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহ সংকটের কারণে খুচরা বাজারে বিশেষ করে শুকনো খাদ্যপণ্যের দাম আরও বেশি বেড়েছে।
শিল্প খাতেও এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী জানিয়েছে, বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে তাদের সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের হিসাব বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এস এম মুজিবুর রহমান জানান, প্রতিষ্ঠানটি সাধারণত প্রতিদিন ২৮০ থেকে ৩০০ টন পণ্য সরবরাহ করলেও গত সপ্তাহে তা কমে প্রতিদিন মাত্র ৫০ থেকে ৬০ টনে নেমে এসেছে। চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠানের ডিপো আংশিক পানিতে ডুবে যাওয়ায় টানা চার দিন কোনো যানবাহন বের করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে আরেকটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, গত দুই থেকে তিন দিন ধরে পর্যাপ্ত পরিবহন পাওয়া যাচ্ছে না। আবার যানবাহন পাওয়া গেলেও অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় পণ্য পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজার, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া এবং সিলেট শহরের কিছু এলাকায় সরবরাহ কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে বাজারে বড় ধরনের সংকট না দেখা দিলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নির্ভর করছে আবহাওয়ার ওপর। যদি বৃষ্টি দ্রুত কমে এবং পরিবহন ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়, তাহলে সরবরাহ শৃঙ্খলও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে। তবে ভারী বর্ষণ ও বন্যা দীর্ঘায়িত হলে কৃষি উৎপাদন, পরিবহন এবং আমদানি—এই তিন খাতেই একযোগে চাপ বাড়বে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

