বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া বিপুল অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ এখন বড় ধরনের বাস্তব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তদন্তকারীরা কিছু ক্ষেত্রে অর্থ দেশের বাইরে যাওয়ার প্রাথমিক পথ শনাক্ত করতে পারলেও, সেই অর্থ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে জমা হয়েছে, কার নামে রাখা হয়েছে, কিংবা কোন প্রতিষ্ঠানের আড়ালে লুকানো হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
সমস্যার মূল কারণ হলো, পাচারকারীরা এখন আর সরাসরি এক দেশ থেকে আরেক দেশে টাকা পাঠিয়ে থেমে থাকে না। তারা অর্থের পথ আড়াল করতে একাধিক দেশ, ভুয়া প্রতিষ্ঠান, বেনামি হিসাব, বিদেশি আর্থিক কেন্দ্র এবং করস্বর্গ হিসেবে পরিচিত অঞ্চলের আশ্রয় নিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ থেকে টাকা বের হওয়ার প্রথম ধাপ ধরা পড়লেও, দ্বিতীয়, তৃতীয়, এমনকি চতুর্থ বা পঞ্চম দেশে পৌঁছানোর পর সেই অর্থের প্রকৃত গন্তব্য অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে।
অর্থ পাচারের আকার কত বড়
সম্প্রতি প্রকাশিত অর্থনীতির অবস্থা নিয়ে প্রণীত শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন ডলার অবৈধভাবে বাইরে চলে গেছে। গড় হিসাবে প্রতি বছর প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিমাণ অর্থ কোনো সাধারণ সংখ্যা নয়। এটি দেশের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, কর আহরণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। যে অর্থ দেশে শিল্প, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যবহার হতে পারত, তার বড় অংশ চলে গেছে বিদেশি ব্যাংক হিসাব, সম্পদ, কোম্পানি বা বেনামি বিনিয়োগের আড়ালে।
শ্বেতপত্রে ব্যাংক খাতের ঋণ খেলাপি, আমদানি-রপ্তানিতে অতিমূল্যায়ন ও নিম্নমূল্যায়ন, ভুয়া আর্থিক লেনদেন এবং অন্যান্য অনিয়মকে অর্থ পাচারের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক লেনদেনের কাগজপত্রে কারসাজি করে অর্থ বাইরে পাঠানো অনেক সময় সরাসরি ব্যাংক লেনদেনের চেয়েও কঠিনভাবে শনাক্তযোগ্য হয়ে ওঠে।
তদন্তকারীরা কোথায় আটকে যাচ্ছেন
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে মুদ্রা পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধবিষয়ক কার্যকরী কমিটির ২৮তম সভার কার্যবিবরণীতে এই জটিলতার চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। ২১ মে অনুষ্ঠিত ওই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট বিভিন্ন দেশে পাচার হওয়া অর্থের পথ খুঁজছে। এখন পর্যন্ত যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, সাইপ্রাস, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ভারত, লুক্সেমবার্গ এবং ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের প্রমাণ বা সূত্র পাওয়া গেছে।
এর বাইরে আইল অব ম্যান, জার্সি, গার্নসি এবং সেন্ট কিটস ও নেভিসের মতো করস্বর্গ এবং বিশেষ আর্থিক অঞ্চলেও পাচার হওয়া অর্থের সূত্র মিলেছে। এসব অঞ্চল সাধারণত গোপনীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বেনামি মালিকানা এবং জটিল কর কাঠামোর কারণে আন্তর্জাতিক অর্থ পাচারকারীদের কাছে আকর্ষণীয়।
কিন্তু তদন্তের বড় বাধা এখানেই। কোনো দেশে অর্থ গেছে—এ তথ্য পাওয়া আর সেই অর্থ ফেরত আনা এক বিষয় নয়। তদন্তকারীরা অনেক সময় জানতে পারেন যে একটি নির্দিষ্ট হিসাবে টাকা জমা হয়েছিল। কিন্তু পরে দেখা যায়, সেই হিসাবে আর টাকা নেই। অর্থটি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি, কোম্পানি বা বিদেশি হিসাবের মাধ্যমে আরও দূরে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
স্তরে স্তরে অর্থ লুকানোর কৌশল
অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কৌশল হলো স্তর তৈরি করা। প্রথমে টাকা দেশ থেকে বের করা হয়। এরপর সেটি একাধিক ব্যাংক হিসাব, কোম্পানি, বিনিয়োগ প্রকল্প, সম্পদ ক্রয় বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিটি ধাপে টাকার উৎসকে আরও অস্পষ্ট করে তোলা হয়।
এ ধরনের কৌশলে ভুয়া কোম্পানি, নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান, আত্মীয়স্বজনের নামে হিসাব, বিদেশি নাগরিকের নামে সম্পদ, করস্বর্গে নিবন্ধিত কোম্পানি এবং ব্যবসায়িক চুক্তির আড়াল ব্যবহার করা হয়। এর ফলে কাগজে-কলমে মনে হয় অর্থটি বৈধ বিনিয়োগ, বাণিজ্যিক লেনদেন বা ঋণ পরিশোধের অংশ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেটি অবৈধ অর্থ লুকানোর একটি ধাপ হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, গত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিদেশে যেসব হিসাবে পাচারকৃত অর্থ রাখা হয়েছে, তার অধিকাংশের পূর্ণাঙ্গ তথ্য বাংলাদেশের কাছে নেই। আবার কিছু হিসাবের তথ্য পাওয়া গেলেও দেখা গেছে, সেখানে অর্থ আর নেই। টাকা আগেই অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের হিসাব, কোম্পানি বা ব্যক্তির নামে স্থানান্তর করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো সেই পরবর্তী হিসাবগুলোর তথ্য এখনো দেয়নি।
এই অবস্থায় তদন্তকারীদের সামনে দুটি কাজ একসঙ্গে দাঁড়ায়। প্রথমত, অর্থের পথ অনুসরণ করে চূড়ান্ত গন্তব্য খুঁজে বের করা। দ্বিতীয়ত, আইনি প্রক্রিয়ায় সেই অর্থের ওপর দাবি প্রতিষ্ঠা করা। দুটিই সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল।
আন্তর্জাতিক তথ্য পাওয়া কেন কঠিন
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, আন্তর্জাতিক উৎস থেকে তথ্য পাওয়া সহজ নয়। এর একটি বড় কারণ হলো, যেসব দেশে অর্থ পাচারের প্রমাণ মিলেছে, সেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের এখনো পর্যাপ্ত তথ্য বিনিময় চুক্তি নেই। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অনুরোধ করলেও দ্রুত বা পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায় না।
তিনি আরও বলেছেন, পাচার হওয়া অর্থ অনেক সময় তৃতীয়, চতুর্থ বা পঞ্চম দেশে চলে গেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে যে দেশে প্রথম টাকা গেছে, সেখানেই তা শেষ পর্যন্ত থাকেনি। এই ধারাবাহিক স্থানান্তর তদন্তকে আরও জটিল করে তোলে।
তার মতে, কিছু ব্যাংকের ফরেনসিক নিরীক্ষায় কারা অর্থ পাচার করেছে, সে বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। কিন্তু অভিযুক্তদের অনেকেই এখন দেশে নেই। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে আন্তর্জাতিক তথ্য সংগ্রহ, ফৌজদারি মামলা, গ্রেপ্তারের উদ্যোগ এবং সম্পদ শনাক্তকরণ—সবকিছু একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
আইনি সহায়তার বড় বাধা
২১ মে অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি জানান, বিদেশি রাষ্ট্রের কাছে পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধ পাঠানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো যথেষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা। প্রত্যেক দেশের নিজস্ব আইন, আদালতের মানদণ্ড এবং প্রমাণ গ্রহণের পদ্ধতি রয়েছে। বাংলাদেশ যদি সেই মানদণ্ড অনুযায়ী তথ্য দিতে না পারে, তাহলে অনুরোধ কার্যকর হতে দেরি হয় বা প্রত্যাখ্যাতও হতে পারে।
এ কারণে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, শুধু আনুষ্ঠানিক আইনি অনুরোধের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বিদেশি আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি যেসব দেশে অনুরোধ পাঠানো হচ্ছে, সেসব দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস বা মিশনকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। কূটনৈতিক যোগাযোগ, আইনি সমন্বয় এবং আর্থিক তথ্য সংগ্রহ—এই তিনটি পথ একসঙ্গে কাজে লাগাতে হবে।
সরকারের কৌশল কী
চুরি হওয়া সম্পদ ফেরত আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে একটি আন্তঃসংস্থা কার্যদল কাজ করছে। এতে বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় যুক্ত রয়েছে।
এই কার্যদলে বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের কাজ হলো পাচার হওয়া অর্থের পথ অনুসন্ধান করা এবং প্রমাণ উপস্থাপন করা। এরপর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সেই তথ্যের ভিত্তিতে মামলা, সম্পদ জব্দ, বিদেশি সহায়তা চাওয়া এবং আইনি পদক্ষেপ এগিয়ে নেয়।
সরকার প্রাথমিকভাবে ১০টি দেশকে পাচার হওয়া অর্থের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মালয়েশিয়া, হংকং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত পারস্পরিক আইনি সহায়তার আওতায় সহযোগিতার বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং সুইজারল্যান্ড আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আওতায় সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অর্থ পাচার মামলা নিয়মিত পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে। এসব মামলার অগ্রগতি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় চলছে।
সংসদে যে তথ্য জানানো হয়েছে
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি জাতীয় সংসদে জানান, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত দেশে ও বিদেশে মোট ৭৬ হাজার ৮১৪ কোটি টাকার অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, অর্থ পাচারের অভিযোগে মোট ১৪২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি মামলায় অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে এবং ৬টি মামলায় রায় হয়েছে।
২৪ জুন জাতীয় সংসদে এক লিখিত জবাবে তিনি বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে বাংলাদেশ এখনো কোনো দেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করেনি। তবে সরকার প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত ১০টি দেশের সঙ্গে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে। দেশগুলো হলো কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড এবং হংকং।
মন্ত্রী জানান, মালয়েশিয়া, হংকং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং সুইজারল্যান্ড সমঝোতা স্মারক ও মামলাভিত্তিক চুক্তির মতো বিকল্প পদ্ধতির পরামর্শ দিয়েছে।
সরকার আরও কয়েকটি দেশকে সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং ভবিষ্যতে তাদের সঙ্গেও আইনি সহায়তা চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ব্যাংকগুলোর ক্ষতি ও আন্তর্জাতিক আইনজীবী নিয়োগ
অর্থ পাচারের অনেক ঘটনা ব্যাংক খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়া, ভুয়া বিনিয়োগ, কাগজে-কলমে ব্যবসা দেখিয়ে টাকা বাইরে পাঠানো—এসব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। সরকার শুধু ফৌজদারি মামলার ওপর নির্ভর করছে না; দেওয়ানি আইনি প্রক্রিয়াকেও কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।
প্রায় ৩০টি ব্যাংক, যারা বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং যেসব ঋণের অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ আছে, তারা ৯টি আন্তর্জাতিক আইনজীবী প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে এমন শর্তে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যাতে অর্থ উদ্ধার হলে তারা পারিশ্রমিক পায়, আর অর্থ উদ্ধার না হলে আলাদা ফি দিতে না হয়। কঠোর গোপনীয়তা চুক্তির আওতায় তারা সম্পদ শনাক্ত, আইনি দাবি প্রস্তুত এবং অর্থ পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে।
এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে প্রমাণের মান, বিদেশি আদালতের সহযোগিতা, সম্পদের অবস্থান শনাক্তকরণ এবং অভিযুক্তদের আইনি অবস্থানের ওপর।
ডিজিটাল লেনদেন ও নতুন ঝুঁকি
কার্যকরী কমিটির বৈঠকে ভার্চুয়াল সম্পদ ও ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি নিষিদ্ধ হলেও, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের এক প্রতিনিধি জানান, ভার্চুয়াল আর্থিক লেনদেনে এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত লেনদেনে এ ধরনের মাধ্যম ব্যবহার হচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ ধরনের লেনদেন তদন্তকারীদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। কারণ প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা ডিজিটাল লেনদেনের পথ অনেক সময় দ্রুত বদলে যায় এবং শনাক্ত করা কঠিন হয়। এ কারণে বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন যৌথভাবে বিশেষ প্রশিক্ষণ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। লক্ষ্য হলো ডিজিটাল আর্থিক অপরাধ অনুসন্ধানে তদন্তকারীদের দক্ষতা বাড়ানো।
আন্তর্জাতিক মূল্যায়নের চাপ
বাংলাদেশ শিগগিরই এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় মুদ্রা পাচারবিরোধী গোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ পারস্পরিক মূল্যায়নের মুখোমুখি হবে। এই মূল্যায়নে একটি দেশের অর্থ পাচার প্রতিরোধ ব্যবস্থা, সন্ত্রাসে অর্থায়ন রোধের সক্ষমতা, আইনি কাঠামো, তদন্ত দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মান যাচাই করা হয়।
এই প্রক্রিয়াকে সামনে রেখে কমিটি একটি প্রধান সংস্থা, একটি কারিগরি সমন্বয়কারী এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা এবং অর্থ পাচারবিরোধী ব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে প্রতিরোধই বেশি কার্যকর
অর্থ পাচার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে চলে যাওয়া টাকা ফেরত আনা দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত প্রক্রিয়া। অনেক দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, পাচার হওয়া অর্থের খুব সামান্য অংশ শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করা যায়। মামলা, আদালত, প্রমাণ, বিদেশি আইন, আপিল, সম্পদ শনাক্তকরণ—সব মিলিয়ে এই প্রক্রিয়া বহু বছর ধরে চলতে পারে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল। তার মতে, অতীতে বিলম্বের পেছনে কারিগরি জ্ঞানের ঘাটতি এবং অর্থ পাচারের জটিল স্তরভিত্তিক কৌশল সম্পর্কে দুর্বল বোঝাপড়া কাজ করেছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ এখনো প্রকৃত মালিকানা স্বচ্ছতা আইন প্রণয়ন করেনি এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক তথ্য বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ডে যুক্ত হয়নি। এসব ব্যবস্থা থাকলে বিদেশে থাকা বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক তথ্য পাওয়া সহজ হতে পারত।
তার মতে, চুরি হওয়া সম্পদ উদ্ধারের চেয়ে পাচার ঠেকানো অনেক বেশি কার্যকর। কারণ অর্থ একবার বিদেশে চলে গেলে সেটি ফিরিয়ে আনা কঠিন, ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কিন্তু দেশ থেকে অর্থ বের হওয়ার পথ বন্ধ করা গেলে ক্ষতি আগেই কমানো যায়।
সমস্যার গভীরে আছে শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা
অর্থ পাচার শুধু আর্থিক অপরাধ নয়; এটি শাসনব্যবস্থা, জবাবদিহি, ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ, কর প্রশাসন, আমদানি-রপ্তানি তদারকি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার সঙ্গে যুক্ত। যারা বড় অঙ্কের টাকা পাচার করতে পারে, তারা সাধারণত আর্থিক ব্যবস্থার ভেতরের ফাঁকফোকর, প্রভাবশালী যোগাযোগ এবং দুর্বল নজরদারির সুযোগ নেয়।
ব্যাংক ঋণ অনিয়ম, ভুয়া ব্যবসা, আমদানির নামে অতিরিক্ত মূল্য দেখানো, রপ্তানির আয় দেশে না আনা, বিদেশে সম্পদ কেনা, আত্মীয় বা সহযোগীর নামে কোম্পানি খোলা—এসব কৌশল তখনই সফল হয়, যখন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দুর্বল থাকে বা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জবাবদিহির বাইরে থাকে।
তাই শুধু বিদেশে টাকা খোঁজা যথেষ্ট নয়। দেশের ভেতরেই এমন ব্যবস্থা গড়তে হবে, যাতে সন্দেহজনক লেনদেন দ্রুত শনাক্ত হয়, ব্যাংকগুলো ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ দেওয়ার আগে কঠোর যাচাই করে, আমদানি-রপ্তানি তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ হয় এবং প্রকৃত মালিকানা গোপন রাখার সুযোগ কমে যায়।
সামনে বাংলাদেশের করণীয়
বাংলাদেশের সামনে এখন তিনটি বড় কাজ। প্রথমত, পাচার হওয়া অর্থের পথ অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো। দ্বিতীয়ত, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা পরিচালনা করা। তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে অর্থ পাচার ঠেকাতে দেশের ভেতরের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
এ জন্য বিদেশি আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি, দক্ষ তদন্তকারী দল, আন্তর্জাতিক আইনজীবী, আধুনিক ডিজিটাল অনুসন্ধান প্রযুক্তি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা—সবকিছুর সমন্বয় দরকার।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের লড়াইকে শুধু তাৎক্ষণিক আলোচনার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রশ্ন। যেসব দেশ নিজেদের আর্থিক ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং তথ্যভিত্তিক করেছে, তারা অর্থ পাচার প্রতিরোধে তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই বিদেশে লুকানো অর্থ ফেরত আনতে চায়, তবে শুধু অভিযুক্তদের নাম জানা যথেষ্ট নয়। অর্থ কোথায় আছে, কীভাবে গেছে, কার নামে আছে, কোন আইনি কাঠামোর আড়ালে আছে এবং কোন আদালতে দাবি তোলা যাবে—এসব বিষয়ে নির্ভুল প্রমাণ দরকার। সেই সঙ্গে দেশে এমন ব্যবস্থা গড়তে হবে, যাতে ভবিষ্যতে একই পথ ব্যবহার করে নতুন করে অর্থ পাচার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অর্থ ফেরত আনার লড়াই তাই শুধু বিদেশে নয়, দেশের ভেতরেও। কারণ টাকা বাইরে যাওয়ার দরজা বন্ধ না করলে, বিদেশে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া টাকার পেছনে ছুটে চলা কখনোই যথেষ্ট হবে না।

