বিশ্ব পোশাক বাণিজ্যে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের শক্ত অবস্থান এখন নতুন এক পরীক্ষার মুখে। বৈশ্বিক বাজারের আকার বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধির সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি দেশের তৈরি পোশাক শিল্প। বরং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব কিছুটা কমেছে, অন্যদিকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম দ্রুত এগিয়ে এসে দুই দেশের রপ্তানির ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে ফেলেছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি বছরে বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানি ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু একই সময়ে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ। অর্থাৎ বিশ্ববাজার যে গতিতে এগিয়েছে, বাংলাদেশের পোশাক খাত সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারেনি। আন্তর্জাতিক গড়ের তুলনায় দেশের প্রবৃদ্ধি প্রায় পাঁচ গুণ কম।
এই চিত্রটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ কারণ ঠিক এক বছর আগেও পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। ২০২৪ সালে বিশ্ববাজারের গড় প্রবৃদ্ধির তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি হারে রপ্তানি বাড়াতে সক্ষম হয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ থাকলেও তার পুরো সুফল হাতছাড়া হয়েছে।
কমছে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অংশ
ধীরগতির রপ্তানির প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানের ওপরও। ২০২৪ সালে বিশ্ব পোশাক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব ছিল ৭ শতাংশ। কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তা কমে ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
অর্থাৎ আগের বছরের অর্জনের একটি অংশ ইতোমধ্যে হারিয়েছে দেশের পোশাক শিল্প। যদিও এই পতন সংখ্যায় খুব বড় নয়, তবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
দ্রুত ব্যবধান কমিয়ে আনছে ভিয়েতনাম
বিশ্ব পোশাক রপ্তানিতে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, দুই দেশের মধ্যে ব্যবধান এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক কম।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে ভিয়েতনামের রপ্তানি হয়েছে ৩৭ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার। ফলে দুই দেশের ব্যবধান এখন মাত্র ১ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার।
তুলনামূলক চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয় আগের বছরের তথ্য দেখলে। ২০২৪ সালে এই ব্যবধান ছিল ২ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার, আর ২০২৩ সালে ছিল ৪ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ব্যবধান প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।
বাজার অংশীদারত্বের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ, আর ভিয়েতনামের অংশ ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ। দুই দেশের মধ্যে ব্যবধান এখন খুবই সামান্য।
বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা অপরিবর্তিত থাকলে আগামী বছরই বিশ্ব পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যেতে পারে ভিয়েতনাম।
চীনের হারানো বাজার দখলে এগিয়ে অন্যরা
বিশ্ব পোশাক বাণিজ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি সাধারণ প্রবণতা ছিল—চীনের রপ্তানি কমলে তার বড় অংশের সুবিধা পেত বাংলাদেশ। কিন্তু এবার সেই চিত্র বদলে গেছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীনের পোশাক রপ্তানি ৪ দশমিক ৯২ শতাংশ কমেছে। কিন্তু সেই বাজারের বড় অংশ বাংলাদেশ নয়, বরং দখল করেছে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া।
একই সময়ে কম্বোডিয়ার প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ, আর ভিয়েতনামের প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সেখানে মাত্র শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ।
এতে বোঝা যাচ্ছে, বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হলেও তা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে প্রতিযোগী দেশগুলো বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি সফল হয়েছে।
কেন এগিয়ে যাচ্ছে ভিয়েতনাম?
পোশাক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ভিয়েতনামের অগ্রগতির পেছনে একাধিক বাস্তব কারণ রয়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, বৈশ্বিক বাজারের সম্প্রসারণ মূলত চাহিদা বৃদ্ধির কারণে নয়, বরং পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবেও হয়েছে। তবে বাজার যতটুকু বেড়েছে, তার সম্ভাব্য অংশ বাংলাদেশ দখল করতে পারেনি।
তার মতে, চীন থেকে যেসব ক্রয়াদেশ অন্য দেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে, সেগুলো আকর্ষণ করতে ভিয়েতনাম অনেক বেশি সক্ষম হয়েছে।
এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে—
- বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা
- কম সময়ে পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা
- আধুনিক ও কার্যকর বন্দর ব্যবস্থা
- নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থা
- তুলনামূলক দ্রুত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া
এসব সুবিধা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে ভিয়েতনামকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে।
তবে তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ভিত্তি এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। সঠিক নীতিগত সহায়তা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
প্রধান দুই বাজারেই কমছে রপ্তানি
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই প্রধান বাজারেই সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানি কমেছে।
ইউরোপের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমে ৬০৮ দশমিক ৬২ কোটি ইউরোতে নেমেছে। এক বছর আগে একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৭৫৪ দশমিক ৪৭ কোটি ইউরো।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ কমে ২৯৮ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। শুধু এপ্রিল মাসেই রপ্তানি আয় কমেছে ১৭ দশমিক ২১ শতাংশ।
এই দুই বাজার বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় অংশ হওয়ায় এই পতন শিল্পের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। একই সঙ্গে নতুন বাজার সম্প্রসারণ, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ, বন্দর সক্ষমতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্ব পোশাক শিল্প এখন দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, নতুন বাজার ধরতে পারবে এবং উৎপাদন থেকে সরবরাহ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ করতে পারবে, ভবিষ্যতের বাজার মূলত তাদের হাতেই থাকবে। বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেই পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে আবারও প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে আসা।

