স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের টেকসই ও নির্বিঘ্ন উত্তরণ নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের আরও সক্রিয় সহযোগিতা চেয়েছে সরকার। একই সঙ্গে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর অনুরোধও জানানো হয়েছে। সরকারের মতে, এই অতিরিক্ত সময় দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, উত্তরণ কৌশল কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত একাধিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এসব বিষয় তুলে ধরেন। তিনি জাতিসংঘের তিনজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, এলডিসি উত্তরণ, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) বাস্তবায়ন এবং সরকারের সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেন।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল লি জুনহয়ার সঙ্গে বৈঠকে ড. তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তাঁর ভাষ্য, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, স্মুথ ট্রানজিশন কৌশল কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং টেকসই ও অপরিবর্তনীয় উত্তরণ নিশ্চিত করতেই এই সময় বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে।
জবাবে লি জুনহয়া জানান, বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগ (ইউএন ডেসা) আগের মতোই সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। পাশাপাশি এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়াকে সফল ও টেকসই করতে বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (ইউএন-এসক্যাপ) নির্বাহী সচিব ও আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল আর্মিদা সালসিয়াহ আলিসজাহবানার সঙ্গে বৈঠকে ড. তিতুমীর সরকারের চলমান সংস্কার কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে জনগণের দেওয়া গণরায় সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, জবাবদিহিমূলক সুশাসন এবং জনকল্যাণভিত্তিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
এ সময় সরকারের ‘থ্রি আর’—রিকভারি, রিস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসেলারেশন—কৌশলের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, এই কর্মপরিকল্পনা অর্থনীতির স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার একটি সমন্বিত রূপরেখা হিসেবে কাজ করবে।
জবাবে আর্মিদা সালসিয়াহ আলিসজাহবানা বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ, আঞ্চলিক সংযোগ জোরদার এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধিতে ইউএন-এসক্যাপের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে সরকারের সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগের প্রশংসাও করেন তিনি।
এদিকে, ইউএনডিপির এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ব্যুরোর আঞ্চলিক পরিচালক ও সহকারী মহাসচিব কান্নি উইগ্নারাজার সঙ্গে বৈঠকে ড. তিতুমীর গণতান্ত্রিক সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে ইউএনডিপির ধারাবাহিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। জবাবে কান্নি উইগ্নারাজা জানান, সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ইউএনডিপির সহযোগিতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব বৈঠকে মূলত এলডিসি উত্তরণের প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর ও ঝুঁকিমুক্ত করা, এসডিজি বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো এবং চলমান সংস্কার কর্মসূচিকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়।

