সরকারি আমদানি বিল পরিশোধ, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং ঈদ-পরবর্তী সময়ে প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার প্রভাবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে আবারও চাপ বেড়েছে। এর প্রভাবে আন্তব্যাংক বাজারে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বেড়ে ১২৩ টাকায় পৌঁছেছে। যদিও বিশ্লেষকদের মতে, এটি বড় ধরনের সংকটের ইঙ্গিত নয়; বরং চাহিদা ও সরবরাহের সাময়িক ভারসাম্যহীনতার ফল।
এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত প্রায় ৪৫০ কোটি ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাব্যতা মূল্যায়ন করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এবং বাজারের স্থিতিশীলতা আইএমএফের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সোমবার আন্তব্যাংক বাজারে প্রতি মার্কিন ডলারের গড় বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে ১২৩ টাকা। আগের কার্যদিবসে এ হার ছিল ১২২ টাকা ৯৭ পয়সা। চলতি মাসজুড়েই ডলারের দর ১২৩ টাকার আশপাশে রয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলো ১২২ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ডলার লেনদেন করছে। খোলাবাজারেও ডলারের দাম কিছুটা বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী সেখানে প্রতি ডলারের দর ১২৪ থেকে ১২৫ টাকার মধ্যে থাকার কথা।
বাজারসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, জ্বালানি, সারসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং এলসি নিষ্পত্তির কারণে ব্যাংকগুলোর ডলারের চাহিদা বেড়েছে। অন্যদিকে ঈদুল আজহার পর স্বাভাবিকভাবেই রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা কমে যাওয়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহও সংকুচিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, সরকারি আমদানি বিল ও অন্যান্য বৈদেশিক পরিশোধের চাপই মূলত ডলারের বাজারে সাময়িক চাপ তৈরি করেছে। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপাতত বাজার থেকে ডলার কেনা বন্ধ রেখেছে। তাঁর আশা, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, জুনের শেষ দিকে সরকারি আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত ডলার সংগ্রহ করতে হয়েছে। এর প্রভাব আন্তব্যাংক বাজারের বিনিময় হারে প্রতিফলিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে দেশে ২ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এটি মে মাসের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ কম। ঈদুল আজহাকে ঘিরে মে মাসে প্রবাসী আয় বেড়ে ৩ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরীর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি আতঙ্কের নয়, তবে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার কার্যকর রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পারলে ডলারের বাজারে আবারও স্থিতিশীলতা ফিরবে। এদিকে ৯ জুলাই পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিপিএম-৬ অনুযায়ী দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৯০ কোটি ডলার। এক বছর আগে একই সময়ে এই রিজার্ভ ছিল ২ হাজার ৪৪৪ কোটি ডলার।
অন্যদিকে খোলাবাজারের ব্যবসায়ীদের দাবি, ডলারের লেনদেনে তেমন অস্থিরতা নেই। যমুনা মানি এক্সচেঞ্জারের স্বত্বাধিকারী আনিসুজ্জামান জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে সর্বশেষ ডলার বিক্রি হয়েছে ১২৬ দশমিক ৪০ টাকায় এবং কেনা হয়েছে ১২৪ দশমিক ১০ টাকায়। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরেই প্রায় একই দরে লেনদেন চলছে। যদিও এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সীমার তুলনায় কিছুটা বেশি, তবুও এতে বাজারে উল্লেখযোগ্য কোনো অস্থিরতা তৈরি হয়নি।

