চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বৈদ্যুতিক যান (ইভি) শিল্পের জন্য একাধিক কর ও শুল্ক সুবিধা ঘোষণার পর দেশে এই খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের ধারণা, ইতোমধ্যে ঘোষিত ও প্রক্রিয়াধীন প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বেসরকারি বিনিয়োগ বাস্তবায়নের গতি বাড়বে, যা দেশের ইভি শিল্পকে নতুন ধাপে নিয়ে যেতে পারে।
গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, বড় শিল্পগোষ্ঠী, জ্বালানি কোম্পানি এবং ফিলিং স্টেশন পরিচালনাকারীরা ইতোমধ্যে উৎপাদন ও চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তুতি শুরু করেছে। তাদের মতে, ভবিষ্যতে এটি দেশের অন্যতম বড় উৎপাদন ও অবকাঠামোভিত্তিক শিল্পে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, বিনিয়োগের আগ্রহ থাকলেও সবচেয়ে বড় বাধা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি দ্রুত গ্রিড সংযোগ, পর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশন এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক লাভজনকতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাজেটে কী কী সুবিধা দেওয়া হয়েছে:
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বৈদ্যুতিক গাড়ির আমদানি শুল্ক কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে ইভি উৎপাদনে কর প্রণোদনা, চার্জিং যন্ত্রপাতিতে শুল্ক ছাড় এবং চার্জিং স্টেশন পরিচালনাকারীদের জন্য আর্থিক সুবিধার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়া খসড়া ইভি শিল্প উন্নয়ন নীতিমালায় চার্জিং স্টেশন ব্যবসার জন্য ১০ বছরের আয়কর অব্যাহতির প্রস্তাব রয়েছে।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ১,২০০টি বাণিজ্যিক ইভি চার্জিং স্টেশন স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই খাতের নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা)-কে। স্রেডার পরিচালক মো. আমিনুর রহমান জানিয়েছেন, বাণিজ্যিক চার্জিং স্টেশনের জন্য বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়েছে। কারিগরি যাচাই শেষে পর্যায়ক্রমে সেগুলোর অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে।
পাইপলাইনে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ:
শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, বর্তমানে ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। এসব বিনিয়োগ বৈদ্যুতিক গাড়ি, মোটরসাইকেল ও স্কুটার উৎপাদন, সংযোজন এবং চার্জিং অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হবে।
সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ইভি উৎপাদন কারখানা ও চার্জিং নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে ১,৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে। এ ছাড়া নাসির গ্রুপ ও আকিজ মোটরস পৃথকভাবে ৫০০ কোটি টাকা করে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। র্যানকন মোটরস ইভি সংযোজন ও চার্জিং অবকাঠামোয় ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।
রানার অটোমোবাইলস বৈশ্বিক ইভি নির্মাতা বিওয়াইডির সঙ্গে অংশীদারত্বে স্থানীয় উৎপাদন ও চার্জিং অবকাঠামো উন্নয়নে ধাপে ধাপে ২৬০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। প্রাণ-আরএফএল ও ওয়ালটন গ্রুপও বৈদ্যুতিক স্কুটার এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ২০০ কোটি টাকা করে বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে।
এ ছাড়া টিএমএসএস, প্রোগ্রেস মোটরস, সেনা হোটেল (র্যাডিসন ব্লু), কাজী এলপিজি, গুড লাক ফিলিং স্টেশন ও ঈশা খাঁ গ্রুপসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান চার্জিং স্টেশন স্থাপনে অনুমোদন পেয়েছে বা বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
স্রেডার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩২টি বাণিজ্যিক চার্জিং স্টেশন অনুমোদন পেলেও বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র ৯টি। এগুলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও কুমিল্লায় অবস্থিত। অন্যদিকে, ভারতে সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২৯ হাজারের বেশি পাবলিক চার্জিং স্টেশন রয়েছে। নেপালে রয়েছে প্রায় ৪০০টি এবং পাকিস্তানে ১০০টির বেশি চার্জিং স্টেশনের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।
স্রেডার পরিচালক জানান, বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক ডিসি ফাস্ট চার্জিং স্টেশনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং এসব স্থাপনার জন্য ভূমি, যন্ত্রপাতি, বিদ্যুতের মান ও বিনিয়োগসংক্রান্ত বিস্তারিত নির্দেশিকা অনুসরণ করা হচ্ছে।
বায়ুদূষণ কমানো এবং নগর পরিবহন আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ঢাকায় ৪০০টি বৈদ্যুতিক বাস চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্যোগটি সফল করতে পর্যাপ্ত চার্জিং অবকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
রানার অটোমোবাইলসের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান খান বলেন, তাদের বিক্রি হওয়া প্রতিটি বিওয়াইডি গাড়ির সঙ্গে হোম চার্জার দেওয়া হয়, যা সাধারণ গৃহস্থালি বিদ্যুৎ সংযোগেই ব্যবহার করা যায়। তবে বাণিজ্যিক চার্জিং স্টেশনের জন্য উচ্চমানের ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অপরিহার্য। তার ভাষ্য, ঘরে একটি গাড়ি চার্জ হতে সাধারণত ৫ থেকে ১০ ঘণ্টা লাগে। কিন্তু মহাসড়কের আল্ট্রা-ফাস্ট ডিসি চার্জিং প্রযুক্তিতে মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে চার্জ সম্পন্ন করতে হলে শক্তিশালী বিদ্যুৎ অবকাঠামো প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, একটি সাধারণ ডিসি ফাস্ট চার্জিং স্টেশন স্থাপনে প্রায় ১ থেকে দেড় কোটি টাকা লাগে। আর জমি ও নিজস্ব সাবস্টেশনসহ আল্ট্রা-ফাস্ট চার্জিং স্টেশন নির্মাণে ব্যয় ৩ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এত বড় বিনিয়োগের পর লাভজনক অবস্থায় পৌঁছাতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
ক্র্যাক প্লাটুন চার্জিং সল্যুশনসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা শাহরিয়ার হাসান উৎস বলেন, অনেক উদ্যোক্তা চার্জিং স্টেশন স্থাপনে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তবে প্রায় সবারই একটি প্রশ্ন—বিনিয়োগের অর্থ ফেরত আসতে কত সময় লাগবে। তার মতে, বর্তমানে ইভির সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় অনেক স্টেশনেই পর্যাপ্ত গ্রাহক পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বিনিয়োগের লাভজনকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। একটি চার্জিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক জানান, ১০ কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি লেভেল-২ চার্জার স্থাপনে প্রায় ৭০ লাখ টাকা ব্যয় হলেও গ্রাহক এখনও সীমিত। তবে ভবিষ্যতে চাহিদা বাড়বে বলে তারা আশাবাদী।
স্রেডার পরিচালক আমিনুর রহমান বলেন, বর্তমান বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বাস্তবতা বিবেচনায় ডিসি ফাস্ট চার্জিং স্টেশনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট এলাকায় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, ভবিষ্যতে সৌরশক্তিনির্ভর চার্জিং স্টেশন চালুতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রানার অটোমোবাইলস ইতোমধ্যে ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, বগুড়া ও কক্সবাজারে বিওয়াইডি গ্রাহকদের জন্য চার্জিং পয়েন্ট স্থাপন করেছে। পাশাপাশি কারিগরি জনবল প্রশিক্ষণের কাজও চলছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তারা বাংলাদেশে এক হাজারের বেশি বিওয়াইডি গাড়ি বিক্রি করেছে।
নাসির গ্রুপ জানিয়েছে, তারা শুধু গাড়ি উৎপাদন নয়, চার্জিং অবকাঠামোতেও বিনিয়োগ করছে, কারণ ভবিষ্যতে এই বাজার উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হবে বলে তারা বিশ্বাস করে। বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মাসুদুল করিম বলেন, তাদের স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ইভি একবার পূর্ণ চার্জে ৪৫০ কিলোমিটারের বেশি চলতে পারবে এবং ৩০ মিনিটে ফাস্ট চার্জিং সুবিধা থাকবে।
অডি বাংলাদেশ ও ‘এখন চার্জ’ জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে ১৫০টি হোম চার্জিং ইউনিট এবং পাঁচটি বাণিজ্যিক চার্জিং স্টেশন স্থাপন করেছে। দেশের যেকোনো স্থানে চার্জিং অবকাঠামো স্থাপনের সক্ষমতাও তাদের রয়েছে।
বর্তমানে মহাসড়কে একটি বৈদ্যুতিক গাড়ি পূর্ণ চার্জ দিতে আনুমানিক ৩০৮ থেকে ৭৫৯ টাকা খরচ হয়। এতে প্রতি কিলোমিটার পরিচালন ব্যয় পেট্রোলচালিত গাড়ির তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদের মতে, দেশে প্রায় ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান চললেও আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত বৈদ্যুতিক যাত্রীবাহী গাড়ির সংখ্যা এখনও কয়েক হাজার। ফলে নির্ভুল তথ্যের অভাবে কার্যকর নীতি প্রণয়ন কঠিন হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেনের মতে, এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, বাজেটে দেওয়া প্রণোদনা বৈদ্যুতিক যান শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে বিদ্যুৎ অবকাঠামো, চার্জিং নেটওয়ার্ক, নীতিগত সহায়তা এবং বিনিয়োগের সফল বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

