২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে এগিয়ে নিতে সরকার যে কর-সুবিধা ঘোষণা করেছে, তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্প খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নতুন বাজেট অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও আগাম কর কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সুবিধার ফলে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে এবং শিল্প খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নতুন এই কর সুবিধার কারণে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের আন্তর্জাতিক চাহিদার কারণে দেশের শিল্প খাত বাড়তি চাপের মধ্যে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কম খরচের ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করার এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ৩৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ সরবরাহে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি শিল্প, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ গ্রাহকদের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান নীতিগত সহায়তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এজন্য শুধু বড় আকারের বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়, শিল্প কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনসহ বিকেন্দ্রীভূত উদ্যোগগুলোতেও গুরুত্ব দিতে হবে।
শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি:
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাত থেকে প্রায় ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় হয়েছে, যা দেশের মোট পণ্য রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি। এই খাতের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববাজারেও এখন উৎপাদনের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা শুধু পণ্যের মান ও দাম নয়, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন কেবল পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়, বরং বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকার অন্যতম শর্ত হয়ে উঠেছে।
এই বাস্তবতায় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ঘোষিত সুবিধাগুলো শিল্প খাতের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর দেওয়া শুল্ক-কর সুবিধা ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত কার্যকর রাখার সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে উৎসাহ তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া মাউন্টিং স্ট্রাকচার, লিথিয়াম সেল, ব্যাটারি প্যাক ও এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কর সুবিধা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম-আয়ন ও সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনে শুল্ক অব্যাহতির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ: কমবে খরচ, বাড়বে স্থায়িত্ব:
বাজেট ঘোষণার পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রজ্ঞাপন সংশোধন করে জানিয়েছে, সৌর সরঞ্জামের ওপর ১ শতাংশ কর কার্যকর হবে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে নিজেদের অর্থায়নে কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করছে। তাদের লক্ষ্য বিদ্যুৎ বিক্রি নয়, বরং নিজেদের জ্বালানি চাহিদার একটি অংশ পূরণ করা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারবে। একই সঙ্গে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমবে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেও সহায়ক হবে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ শিল্পের জন্য লাভজনক হতে পারে। কারণ এতে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ব্যয়ের অনিশ্চয়তা কমবে, পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের উৎপাদন খাত আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
তবে শুধু প্রণোদনা ঘোষণা করলেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নিশ্চিত হবে না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)সহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাজেটে এ খাতে পর্যাপ্ত গুরুত্ব ও আর্থিক সহায়তার ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরেছে। বাস্তবতা হলো, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আকর্ষণে স্পষ্ট পরিকল্পনা, সহজ অর্থায়ন ব্যবস্থা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন কাঠামো প্রয়োজন।
জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলের খসড়ায় এ খাতের উন্নয়নে বেশ কিছু প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ইউটিলিটি স্কেল বিদ্যুৎ প্রকল্পে সরকারি পেমেন্ট গ্যারান্টির সুযোগ অন্যতম। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগে আরও আগ্রহী হতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন উৎপাদনকারী দেশ যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর শিল্পায়নের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্যও এই পথে গতি বাড়ানো জরুরি। ইতোমধ্যে নীতিগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এখন প্রয়োজন ঘোষিত সুবিধাগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন। বাংলাদেশের সামনে একই সঙ্গে দুটি বড় লক্ষ্য রয়েছে—জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো। নবায়নযোগ্য জ্বালানি এই দুই লক্ষ্য অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে।
পরিষ্কার ও সাশ্রয়ী জ্বালানিতে বিনিয়োগে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি সহজ নীতি সহায়তা, অর্থায়নের সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা দেওয়া যায়, তাহলে দেশে টেকসই শিল্পায়নের নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
- লেখক: মো. মহিউদ্দিন রুবেল, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক।

