রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলাধার গুলশান-বনানী-বারিধারা লেকের উন্নয়নে নেওয়া প্রকল্পটি নির্ধারিত সময় পেরিয়ে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলছে। একের পর এক মেয়াদ বাড়ানো এবং ব্যয় বৃদ্ধি সত্ত্বেও প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তবায়নের সমন্বয়ের ঘাটতি, অসম্পূর্ণ কাজ এবং অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তির কারণে প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প শুরুর আগে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। ফলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য, কাজের পরিধি, নকশা, ভূমির প্রয়োজন এবং ব্যয় বাস্তবতার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। বাস্তবায়নের সময় নকশা পরিবর্তন করতে হওয়ায় পরিকল্পনা ও বাস্তব কাজের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়।
২০১০ সালের ৬ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। একই বছরের জুলাইয়ে কাজ শুরু হয় এবং ২০১৩ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় পাঁচ দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৭ মে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ নির্ধারিত তিন বছরের পরিবর্তে প্রকল্পের সময়সীমা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ বছর ৬ মাস।
প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা। পরে তা বাড়িয়ে ৫৫৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা করা হয়, যা মূল ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে ১৬ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৫৬ শতাংশ। এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০৬ কোটি টাকা। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে প্রকল্পটি সচল রাখতে প্রতি বছর মাত্র এক লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
অধিকাংশ লক্ষ্যই পূরণ হয়নি:
প্রকল্পের বিভিন্ন প্রধান কাজ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ডিপিপি অনুযায়ী ৯ লাখ ৫১ হাজার বর্গমিটার লেক খননের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে খনন করা হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৫৮ হাজার ৭৬৭ বর্গমিটার। একইভাবে—
- ৪ হাজার মিটার তীর সংরক্ষণের লক্ষ্য থাকলেও সম্পন্ন হয়েছে ২ হাজার ৪৩৮ মিটার।
- ৩ লাখ ৫১ হাজার ঘনমিটার মাটি ভরাটের বিপরীতে করা হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৩৬১ ঘনমিটার।
- হাতিরঝিল থেকে মরিয়ম টাওয়ার পর্যন্ত ২ হাজার ৬৮২ মিটার লেক ড্রাইভ সড়কের পরিবর্তে নির্মিত হয়েছে ২ হাজার ৪৩৮ মিটার।
তবে ওয়াকওয়ের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ৬ হাজার ২০০ মিটারের বিপরীতে নির্মাণ করা হয়েছে ৮ হাজার ৮৫৮ মিটার। কিন্তু এর অনেক অংশ ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভেঙে গেছে।
আইএমইডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, লেকের পানি বর্তমানে অত্যন্ত দূষিত। বনানী কবরস্থান, চেয়ারম্যানবাড়ী, কড়াইল বস্তিসহ সাতটি স্থানের স্যুয়ারেজ ও ড্রেনের মাধ্যমে অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি লেকে পড়ছে। পাশাপাশি প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্যও নিয়মিত ফেলা হচ্ছে। ফলে লেকের পানি নোংরা, দূষিত এবং ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এখনো স্যুয়ারেজ লাইন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা এবং বিকল্প নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া লেকপাড়ে পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা, বিশ্রামাগার ও নাগরিক সুবিধাও গড়ে ওঠেনি।
প্রাথমিকভাবে ৮০ একর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা কমিয়ে ১৪ একরে নামিয়ে আনা হয়। এরপরও প্রকল্প শুরুর ১৬ বছর পরও বাড্ডা ও ভাটারা মৌজার ৩ দশমিক ২১ একর জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়নি। লেকপাড়ে ৪ হাজার গাছ লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লেকপাড়ের ওয়াকওয়ে ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সড়কবাতি স্থাপন করা হয়নি। ফলে সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় চুরি, ছিনতাই ও মাদক সেবনের ঘটনা ঘটছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২৩ অডিট আপত্তির মধ্যে ১৪টি এখনো নিষ্পত্তিহীন:
প্রকল্পে মোট ২৩টি অডিট আপত্তি ওঠে। এর মধ্যে ৯টি নিষ্পত্তি হলেও ১৪টি এখনো অনিষ্পন্ন রয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য প্রতি তিন মাস অন্তর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) ও প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিআইসি) সভা হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত ৪৮টির বিপরীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে মাত্র ৮টি, যা মোট প্রয়োজনীয় সভার প্রায় ১৬ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্প কার্যালয়, জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট আবাসন সোসাইটিগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের অভাব ছিল। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকিও দুর্বল ছিল।
রাজউকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক ড. ছাবের আহমেদ বলেন, প্রকল্পের মূল কাজ অনেক আগেই সম্পন্ন হয়েছে এবং সেগুলো সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দীর্ঘদিন প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর উল্লেখযোগ্য নতুন কাজ হয়নি এবং বর্তমানে বড় ধরনের কাজও বাকি নেই। প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণেই প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে বলে তিনি জানান।
নগর পরিকল্পনাবিদ এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, এত দীর্ঘ সময় পার হলেও প্রকল্পটি প্রত্যাশিতভাবে বাস্তবায়িত হয়নি, যা হতাশাজনক। তাঁর মতে, এর ফলে নগর ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত সুফলও পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানান।

