মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা আরও বিস্তৃত আকার নিতে পারে—এমন আশঙ্কা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার পাশাপাশি ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীকে লোহিত সাগরের বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে চাপ বাড়ানোর নির্দেশ দিতে পারে ইরান। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ একসঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়বে, যার প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক ও অবকাঠামোগত স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে। ইরানি গণমাধ্যমের দাবি, এসব হামলায় বন্দর খামির এলাকার একাধিক সেতু, উপকূলীয় রেলস্টেশন এবং ইরানশাহর বিমানবন্দর লক্ষ্যবস্তু হয়। একই সঙ্গে বন্দর খামিরে হামলায় অন্তত সাতজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ। তবে নিহতের সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
এদিকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, হামলার জবাবে ইরান বাহরাইন, কুয়েত ও সিরিয়ায় মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। যদিও এসব ঘটনার সব তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে তেহরানের দুটি উচ্চপর্যায়ের সূত্র এবং একটি আঞ্চলিক সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, হুতি গোষ্ঠীকে প্রয়োজন হলে বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে ইরান কিংবা হুতি গোষ্ঠীর কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
হুতিসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, চূড়ান্ত নির্দেশনা পেলে তারা লোহিত সাগরের প্রবেশপথে অভিযান চালানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কৌশলগত এলাকাগুলোতে ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে আরও বলা হয়েছে, সম্ভাব্য এই পরিকল্পনার তথ্য সৌদি আরবের কাছেও পৌঁছেছে। ফলে রিয়াদ পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই দুই সমুদ্রপথ?
বিশ্বের জ্বালানি ও বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালি এবং বাব এল-মান্দেব প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জ্বালানি পরিবহনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে এবং প্রায় ৭ শতাংশ লোহিত সাগর হয়ে পরিবাহিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই দুই পথেই একযোগে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যয় ও সময় উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য কী ঝুঁকি?
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিও চাপের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার কার্যক্রম এবং সামগ্রিক উৎপাদন খরচ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। ইউরোপগামী অধিকাংশ কনটেইনারবাহী জাহাজ লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল ব্যবহার করে। এই পথ ব্যাহত হলে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
এতে পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি পণ্য পৌঁছাতে অতিরিক্ত ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগতে পারে। ফলে সময়মতো রপ্তানি সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামও বেড়েছে। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৫ ডলারের বেশি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) প্রায় ৮০ ডলারে পৌঁছেছে। চলতি সপ্তাহে দুই ধরনের তেলের দামই প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ লেনদেনে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার ব্যারেলপ্রতি ৮৫ দশমিক ২৮ ডলার এবং ডব্লিউটিআই ফিউচার ৮০ দশমিক ২ ডলারে লেনদেন হয়েছে।
পর্যাপ্ত মজুতের আশ্বাস বিপিসির:
বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও দেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানান, বর্তমানে দেশে ৬০ দিনের বেশি জ্বালানি তেল মজুত রাখার সক্ষমতা রয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এটি ৭১ দিনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ২০২৭ সালের মধ্যে ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সংরক্ষণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির পাশাপাশি আরও ১১টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে বৈশ্বিক সংকটের সময়ও সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা যায়।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশে মোট জ্বালানি তেলের সম্ভাব্য চাহিদা ৮৪ লাখ ২৬ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ডিজেলের চাহিদা সর্বোচ্চ ৪৪ লাখ ৭৩ হাজার মেট্রিক টন। বর্তমানে বিপিসির সংরক্ষণ সক্ষমতা অনুযায়ী ডিজেল ৫৭ দিন, ফার্নেস অয়েল ৭৮ দিন, অকটেন ৪৬ দিন এবং পেট্রল ২৯ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। ভবিষ্যতে এই সক্ষমতা ৯০ দিনে উন্নীত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

