কারখানা চালানোর জন্য প্রয়োজন ১০ পিএসআই গ্যাসের চাপ। কিন্তু বাস্তবে মিলছে তার সামান্য অংশ। দিনের পর দিন কম চাপের গ্যাসে উৎপাদন চালাতে গিয়ে একের পর এক সমস্যায় পড়ছে দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো। কেউ বিকল্প জ্বালানির পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করছে, কেউ আবার কারখানা বন্ধের ঝুঁকিতে পড়েছে।
স্পিনিং মিল উদ্যোক্তা খোরশেদ আলমের অভিজ্ঞতাই এর বড় উদাহরণ। তার কারখানার জন্য অনুমোদিত গ্যাসের চাপ ১০ পিএসআই। শিল্পকারখানার গ্যাস ইঞ্জিন ও বয়লার স্বাভাবিকভাবে চালানোর জন্য সাধারণত এই চাপ প্রয়োজন হয়। কিন্তু গত সাড়ে চার বছর ধরে তার কারখানায় গড়ে মাত্র ১ দশমিক ৫ পিএসআই চাপের গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। এর প্রভাবে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তিনি।
সমস্যার সমাধানে বারবার সংশ্লিষ্ট সংস্থার দ্বারস্থ হয়েছেন খোরশেদ। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিকে দিয়েছেন ৪৪টি চিঠি। জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলাকেও অবহিত করেছেন বিষয়টি। কিন্তু পরিস্থিতির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ব্যাটারি স্টোরেজ সুবিধাসহ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় প্রায় ৮ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন তিনি। এতে কিছুটা সহায়তা মিললেও কারখানাকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর মতো সমাধান হয়নি। খোরশেদের মতো একই সংকটে পড়েছেন দেশের অনেক শিল্প উদ্যোক্তা।
টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তা রেজা গ্রুপের চেয়ারম্যান এ কে এম শহীদ রেজা তার টেক্সটাইল কারখানা বিক্রি করার সম্ভাবনা খুঁজছেন। দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজার প্রতিযোগিতার চাপে এমন সিদ্ধান্তের কথা ভাবছেন তিনি।
বন্ধ হয়েছে ২৩৪ টেক্সটাইল মিল:
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) বলছে, ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ২৩৪টি টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে ১১৪টি স্পিনিং মিল। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো উইভিং, ডাইং ও অন্যান্য টেক্সটাইল খাতের। বন্ধ হয়ে যাওয়া মিলগুলোর মধ্যে প্রায় ১২০টি কারখানা বাংলাদেশ ব্যাংকের রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবন উদ্যোগের আওতায় আবার চালুর আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে বাকি ১১৪টি প্রতিষ্ঠানের পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা খুবই সীমিত।
টেক্সটাইল উদ্যোক্তাদের মতে, এ সংকটের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে গ্যাসের দাম সর্বোচ্চ ১৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ডলারের বিপরীতে টাকার প্রায় ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়ন এবং শুল্কমুক্ত বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আওতায় সুতা ও কাপড় আমদানি সহজ হওয়া। তাদের অভিযোগ, এসব কারণে স্থানীয় উৎপাদকরা একদিকে উচ্চ উৎপাদন ব্যয়ের মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে বিদেশি পণ্যের সঙ্গে কঠিন প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।
আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ভাইস চেয়ারম্যান হোসেন মেহমুদ বলেন, তাদের কারখানায় বর্তমানে মাত্র ১ পিএসআই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, যা দিয়ে যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে চালানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, বাধ্য হয়ে জেনারেটর চালাতে বেশি দামের সিএনজি ব্যবহার করতে হচ্ছে।
তার হিসাবে, প্রাকৃতিক গ্যাস দিয়ে এক কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ টাকা। কিন্তু সিএনজি ব্যবহার করলে সেই খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ থেকে ১৫ টাকায়। তবে বাড়তি খরচ করেও নিয়মিত সিএনজি পাওয়া যাচ্ছে না। বাণিজ্যিকভাবে এলপিজিও লাভজনক বিকল্প নয় বলে জানান তিনি। হোসেন মেহমুদের ভাষ্য, গ্যাস সংকটের কারণে অনেক ডাইং ও প্রসেসিং কারখানা কার্যক্রম কমিয়ে দিতে বা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে।
গ্যাসের সংকট এখন আর শুধু টেক্সটাইল খাতের সমস্যা নয়। সিরামিক, টায়ার, ফুটওয়্যারসহ বিভিন্ন শিল্প খাতেও এর প্রভাব পড়ছে। রপ্তানিমুখী ফার সিরামিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইরফান উদ্দিন জানান, দিনের বেলায় তাদের কারখানায় অনেক সময় গ্যাসের চাপ ১ পিএসআইয়ের নিচে নেমে যায়। রাতে কিছুটা বাড়লেও তা সবসময় স্থিতিশীল থাকে না। তিনি বলেন, উৎপাদন বন্ধ রাখা সম্ভব নয় বলে বাধ্য হয়ে এলপিজি ও সিএনজি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে প্রতিদিন বাড়ছে লোকসান।
মেঘনা গ্রুপের টায়ার বিভাগের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লুৎফুল বারী জানান, শ্রীপুরের কারখানার গ্যাস লোড বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছিল এক দশকেরও বেশি আগে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এ বিষয়ে তিতাসকে সুপারিশ করলেও এখনো তা কার্যকর হয়নি। তিনি জানান, সিলেট অঞ্চলের আরেকটি টায়ার কারখানায় দিনে মাত্র ১৬ ঘণ্টা এবং মাসে ২৪ দিন গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যায়। লুৎফুল বারীর মতে, টায়ার উৎপাদন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বারবার জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হলে উৎপাদনশীলতা কমে এবং ক্ষতির পরিমাণ বাড়ে।
বিদ্যুৎ সরবরাহেও অনিশ্চয়তা:
গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল নয় এমন শিল্প প্রতিষ্ঠানও সংকটমুক্ত নয়। জেনিস শুজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির খান বলেন, তাদের প্রধান সমস্যা অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ। তার অভিযোগ, পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বিদ্যুৎ চলে যায়। এতে যন্ত্রপাতির ক্ষতি হয় এবং উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হয়। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্দিষ্ট সময়সূচি আগে থেকে জানানো হলে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারে।
কেন কমছে গ্যাস সরবরাহ?
তিতাস গ্যাস তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, সরবরাহ ঘাটতির কারণে অনেক গ্রাহক কম চাপের সমস্যায় পড়ছেন। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আমদানি করা এলএনজি সরবরাহে ঘাটতিকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত তিতাসের গ্রাহক সংখ্যা ছিল ২৭ লাখ ৮০ হাজার। এর মধ্যে শিল্প গ্রাহক ৫ হাজার ৬৭৩টি।
তিতাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে শিল্প গ্রাহকদের মাসিক গ্যাস সরবরাহ ছিল ৪ হাজার ৩৩০ এমএমসি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৩৭ এমএমসিতে। একই সময়ে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর গ্যাস সরবরাহও মাসে ৪ হাজার ৬৭২ এমএমসি থেকে কমে ৩ হাজার ৯৮৯ এমএমসিতে নেমেছে।
কেন দরকার বেশি চাপের গ্যাস?
শিল্পকারখানার গ্যাস ইঞ্জিন ও বয়লার কার্যকরভাবে চালাতে সাধারণত ৮ থেকে ১০ পিএসআই চাপ প্রয়োজন হয়। পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে অনেক ক্ষেত্রে ১২ থেকে ১৫ পিএসআই পর্যন্ত চাপ দরকার হয়। চাপ ৭ থেকে ৮ পিএসআইয়ের নিচে নেমে গেলে ইঞ্জিনের সক্ষমতা কমে যায়, এমনকি বন্ধও হয়ে যেতে পারে। বয়লার পর্যাপ্ত বাষ্প তৈরি করতে না পারায় ডাইং ও প্রসেসিং কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
২ থেকে ৫ পিএসআই চাপ বড় শিল্পকারখানার জন্য কার্যত সংকটজনক। এতে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়, উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং কারখানাগুলোকে ডিজেল বা সিএনজির মতো ব্যয়বহুল বিকল্পের দিকে যেতে হয়। খোরশেদ আলম বলেন, তাদের কোনো ভর্তুকির গ্যাস প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু নির্ধারিত চাপ অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া। তার ভাষায়, “যে গ্যাসের বিল দিচ্ছি, সেটি ব্যবহার করার মতো পর্যাপ্ত চাপ পেলেই আমরা উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে পারব।” শিল্প উদ্যোক্তাদের প্রশ্ন এখন একটাই—জ্বালানি সংকটের এই চক্র থেকে বের হতে না পারলে দেশের উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা কতটা ধরে রাখা সম্ভব হবে?

