বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বহুল আলোচিত ‘দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ (বিশেষ বিধান) আইন’ আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হয়েছে। তবে আইনটি বাতিল হলেও এর আওতায় করা চুক্তিগুলোর আর্থিক দায় এখনো বহাল রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ কমার বদলে এখনো সরকারের ওপর বড় বোঝা হয়ে রয়ে গেছে।
কেন করা হয়েছিল বিশেষ আইন?
২০১০ সালে দেশে তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের সময় দ্রুত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে এই আইন প্রণয়ন করা হয়। আইনটির মাধ্যমে সাধারণ সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ না করেই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অনুমোদনের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। একই সঙ্গে এই আইনের আওতায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো আদালতে সহজে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগও সীমিত ছিল।
তবে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে হাইকোর্ট আইনের ৬(২) ও ৯ নম্বর ধারাকে অবৈধ ঘোষণা করেন। পরে জাতীয় সংসদ ‘দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ (বিশেষ বিধান) (রহিত) আইন, ২০২৬’ পাস করে। যদিও আইনটি ২৮ নভেম্বর ২০২৪ থেকে কার্যকরভাবে বাতিল ধরা হয়েছে, তবুও এর আওতায় পূর্বে সম্পাদিত চুক্তি ও কার্যক্রম বহাল রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারকে জনস্বার্থে এসব চুক্তি পর্যালোচনার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বড় চাপ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট
আইন বাতিল হলেও সবচেয়ে বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে বিদ্যুৎ উৎপাদকদের দেওয়া ক্যাপাসিটি পেমেন্ট। অর্থাৎ, বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু না থাকলেও কিংবা সেখান থেকে বিদ্যুৎ না কিনলেও নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী উৎপাদকদের অর্থ পরিশোধ করতে হয়।
বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় কিছু অতিরিক্ত সক্ষমতা রাখা স্বাভাবিক বিষয়। কারণ যেকোনো সময় বিদ্যুৎকেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণে যেতে পারে বা হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি উৎপাদন সক্ষমতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থ পরিশোধ করতে হয়।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ও ভাড়া বাবদ ব্যয় হতে পারে ৫২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এ ব্যয় ছিল ৪৮ হাজার ২৬০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) এই খাতে ব্যয়ও ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৬ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা থেকে তা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ৪৫ হাজার ৪৫১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
অন্যদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে বিপিডিবির পরিচালন ঘাটতি প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে। যদিও ভর্তুকি ও পরিচালন ঘাটতি একই হিসাবের অংশ নয়, তবুও উভয় তথ্যই বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপের চিত্র স্পষ্ট করে।
উৎপাদন সক্ষমতা বেশি, তবুও কেন ঘাটতি?
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও বাস্তবে সব সময় সেই সক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামমাত্র উৎপাদন ক্ষমতা থাকলেই তা বাস্তবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে—এমন নয়। অনেক সময় গ্যাস, কয়লা বা আমদানিকৃত জ্বালানির সংকট, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত ত্রুটি কিংবা অতিরিক্ত উৎপাদন ব্যয়ের কারণে কেন্দ্র চালানো যায় না।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ জানায়, ২০ মে ২০২৬ দেশে সর্বোচ্চ ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও তখনও চাহিদা পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট, যেখানে গড় চাহিদা প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াট। এই দুই সংখ্যা সরাসরি তুলনাযোগ্য না হলেও বাস্তব উৎপাদন ও কাগুজে সক্ষমতার মধ্যে বড় পার্থক্য তুলে ধরে।
আমদানিনির্ভর জ্বালানি বাড়িয়েছে ঝুঁকি
বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট বিদ্যুতের ১০.৭ শতাংশ এসেছে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। একই সময়ে বেসরকারি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে গড়ে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ৯.৫ টাকা ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হয়েছে, যেখানে বেসরকারি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের ক্ষেত্রে এই ব্যয় ছিল ৫.৯ টাকা।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের মোট প্রাথমিক জ্বালানির ৬২.৫ শতাংশ এখন আমদানিনির্ভর, যা চার বছর আগে ছিল ৪৭.৭ শতাংশ। বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান মাত্র ২.৩ শতাংশ।
এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট কিংবা টাকার অবমূল্যায়নের প্রভাব সরাসরি দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের ওপর পড়ে।
এখন কী করা প্রয়োজন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন বাতিল হওয়াই যথেষ্ট নয়; এখন প্রয়োজন প্রতিটি বিদ্যুৎ চুক্তির স্বচ্ছ ও স্বাধীন মূল্যায়ন।
যেসব চুক্তিতে জালিয়াতি, ভুল তথ্য বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেগুলো আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জ করা উচিত। আর যেসব চুক্তি বৈধ হলেও অস্বাভাবিক ব্যয় সৃষ্টি করছে, সেগুলো পুনরায় আলোচনার মাধ্যমে সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।
একই সঙ্গে ভবিষ্যতে নতুন বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র বাধ্যতামূলক করা, বাস্তবসম্মত বিদ্যুৎ চাহিদার পূর্বাভাস, নিশ্চিত জ্বালানি সরবরাহ, সঞ্চালন অবকাঠামোর প্রস্তুতি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্পগুলোকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষ আইনটি বাতিল হওয়ায় একটি বিতর্কিত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু এর আওতায় সম্পাদিত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলোর আর্থিক দায় এখনো রাষ্ট্রকে বহন করতে হচ্ছে। ফলে প্রকৃত সংস্কার তখনই দৃশ্যমান হবে, যখন অপ্রয়োজনীয় ক্যাপাসিটি পেমেন্ট কমবে, অলস বিদ্যুৎকেন্দ্র ধাপে ধাপে অবসরে যাবে, চুক্তিগুলো আরও স্বচ্ছ হবে এবং নতুন বিনিয়োগে প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যাবে। আইন বাতিল হয়েছে, এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় কি সত্যিই কমতে শুরু করবে?

