চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে দেশের অন্যতম বড় শিল্পাঞ্চল জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এনএসইজেড) গড়ে তোলার উদ্যোগ এগিয়ে চললেও সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে পানি সরবরাহ। শিল্পকারখানার জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ পানি নিশ্চিত করতে মেঘনা নদী থেকে ১৫০ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি আনার পরিকল্পনা নেওয়া হলেও অর্থায়ন ও পানির দাম নির্ধারণ নিয়ে জটিলতায় প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে আছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সূত্র জানিয়েছে, প্রায় ১০ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখানো দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক সমস্যার কথা জানিয়ে পিছিয়ে গেছে। ফলে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও শেষ করা যায়নি। এর পাশাপাশি পাইপলাইনের পানির মূল্য নির্ধারণ নিয়েও বেজা ও শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে সমঝোতা হয়নি। প্রস্তাবিত পানির দাম বর্তমান শিল্প পানির খরচের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় আপত্তি জানিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।
পানির দাম নিয়ে জটিলতা:
প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রতি এক হাজার লিটার পানির দাম প্রাথমিকভাবে ৯১ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছিল। পরিবহন, ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য খরচ যুক্ত হলে এই দাম বেড়ে প্রায় ১২০ টাকায় দাঁড়ানোর কথা কিন্তু বর্তমানে শিল্পকারখানাগুলো প্রতি এক হাজার লিটার পানির জন্য প্রায় ৩২ টাকা খরচ করে। ফলে নতুন দামে পানি কিনতে আগ্রহী নয় শিল্প উদ্যোক্তারা।
জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিচালক আহসান উল্লাহ বলেন, এত বেশি দামে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পানি কিনতে চাইবে না। তাই প্রকল্প এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে পানির দাম কমানোর উপায় খুঁজতে বলা হয়েছে।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় মেঘনা পাইপলাইন প্রকল্প:
২০২২ সালে অনুমোদন পাওয়া এই প্রকল্পের মাধ্যমে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা-ডাকাতিয়া মোহনা এলাকা থেকে প্রতিদিন ৯০ কোটি লিটার পানি আনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। অথচ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ভবিষ্যতে দৈনিক পানির চাহিদা ১০০ কোটি লিটারের বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পে সরকার ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা ছিল। বাকি ৮ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা আসার কথা ছিল বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে। দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়া ওভারসিজ ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড আরবান ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (কাইন্ড) প্রকল্পের অংশীদার হওয়ার কথা ছিল এবং কোরিয়ার এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নের সম্ভাবনাও ছিল।
তবে দীর্ঘ দূরত্বে নদীর পানি সরবরাহের খরচ বেশি হওয়ায় প্রকল্পটির বাণিজ্যিক কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকার প্রকল্পটিকে টেকসই করতে ৩৫ শতাংশ ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফান্ড (ভিজিএফ) দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও পানির দাম কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নামানো সম্ভব হয়নি।
মিরসরাই, সীতাকুণ্ড ও ফেনীর সোনাগাজী এলাকায় গড়ে ওঠা এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল শুরুতে ৩৩ হাজার ৮০৫ একর জমিতে করার পরিকল্পনা ছিল। পরে উন্নয়ন পরিকল্পনা কমিয়ে প্রায় ২১ হাজার একর করা হয়েছে। তিন ধাপে ৭ হাজার, ১০ হাজার ও ৪ হাজার একর জমিতে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হবে। বর্তমানে বেজার আওতাধীন অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১৬টি কারখানা উৎপাদনে রয়েছে। এছাড়া বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে আরও ১২টি কারখানা চালু হয়েছে। বড় শিল্প এলাকার বিভিন্ন অংশে আরও ২০টির বেশি শিল্প ইউনিট নির্মাণাধীন।
বর্তমানে এনএসইজেডে প্রতিদিন ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে প্রায় ৩০ লাখ লিটার পানি ব্যবহার হচ্ছে। তবে মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, ২০৩০ সালে কাঁচা পানির চাহিদা দাঁড়াবে প্রায় ৫১ কোটি ৬০ লাখ লিটার, ২০৩৫ সালে ৭৩ কোটি লিটার এবং ২০৪০ সালে তা ছাড়িয়ে যাবে ১০০ কোটি লিটার।
ভবিষ্যতের পানির চাহিদা পূরণে বেজা একাধিক উৎস ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ফেনী-মুহুরী-সিলোনিয়া নদী ব্যবস্থা, ছোট ফেনী নদী, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পানি শোধনাগার, সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ এবং হালদা নদীর পানি। তবে পরিবেশগত আপত্তির কারণে হালদা নদী থেকে পানি নেওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে। কারণ হালদা দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত।
বেজা পানির সংকট মোকাবিলায় ৩৮টি গভীর নলকূপ স্থাপন করেছিল। কিন্তু বর্তমানে চালু আছে মাত্র ১২টি। অনেক নলকূপ দূরবর্তী এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে এবং পাম্প পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় সেগুলোর ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে ফেনী-মুহুরী-সিলোনিয়া নদী থেকে পানি নিয়ে প্রতিদিন ৫ কোটি লিটার উৎপাদন ক্ষমতার একটি পানি শোধনাগার নির্মাণ করছে বেজা। ২০১৯ সালের নভেম্বরে প্রায় ৬৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। পরে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৬১ কোটি টাকা। আগামী বছর প্রকল্পটি শেষ করার আশা করছে কর্তৃপক্ষ।
তবে শুষ্ক মৌসুমে ফেনী নদীর পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যায়। পাশাপাশি মিরসরাই এলাকার ভূগর্ভস্থ পানিতেও লবণাক্ততা, আর্সেনিক ও জীবাণু দূষণের ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে সন্দ্বীপ চ্যানেলে প্রতিদিন ৩ কোটি লিটার ক্ষমতার একটি সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে বেজা। তবে এই পদ্ধতি ব্যয়বহুল হওয়ায় এটিকে দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
পানি বেশি লাগে এমন শিল্পে নিরুৎসাহিত করছে বেজা:
পানির সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে বেজা এখন পানি-নির্ভর শিল্প স্থাপনে নিরুৎসাহিত করছে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন পানি শোধনাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বেজার পরিচালক আহসান উল্লাহ বলেন, আপাতত গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানির চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। তবে নতুন নতুন কারখানা চালু হলে পানির প্রয়োজন দ্রুত বাড়বে। তিনি জানান, ৫ কোটি লিটার দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতার পানি শোধনাগার আগামী বছর চালু হওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি সরকার বিকল্প পানির উৎস নিয়েও কাজ করছে।
দেশের বড় শিল্প কেন্দ্র হিসেবে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে পানির নিশ্চয়তা ছাড়া এই বিশাল শিল্প পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হবে। এখন মূল প্রশ্ন—বড় বিনিয়োগের এই শিল্পাঞ্চলের জন্য টেকসই ও সাশ্রয়ী পানির ব্যবস্থা কত দ্রুত নিশ্চিত করা যায়।

