চলতি ২০২৬-২৭ করবর্ষে আয়কর রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের জন্য এসেছে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এবার প্রথমবারের মতো সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কেটে রাখা উৎসে করকে চূড়ান্ত কর হিসেবে ধরা হবে না। এটি অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য হবে এবং বছর শেষে আয়কর রিটার্নে প্রকৃত করের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
এর ফলে যাদের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কর কাটা হয়েছে, তারা অতিরিক্ত অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে একই সময়ে সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াত কমানোর প্রস্তাবও এসেছে। ফলে অনেক করদাতার জন্য করের বোঝা বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
এতদিন সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর যে উৎসে কর কাটা হতো, সেটিই ছিল চূড়ান্ত কর। অর্থাৎ ওই আয়ের জন্য পরে আর আলাদা কর নির্ধারণের প্রয়োজন হতো না। নতুন নিয়মে সেই ব্যবস্থা বদলে গেছে। এখন সঞ্চয়পত্রের মুনাফা বার্ষিক মোট আয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে। এরপর করদাতার প্রকৃত কর নির্ধারণ করা হবে এবং আগে উৎসে কাটা কর সেই করের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। ফলে প্রকৃত করদায়ের তুলনায় বেশি কর কাটা হলে অতিরিক্ত অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে। আবার প্রকৃত কর বেশি হলে বাকি অর্থ পরিশোধ করতে হবে।
কীভাবে মিলবে অতিরিক্ত কর ফেরত:
ধরা যাক, একজন করদাতার সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে সারা বছরে ৩০ হাজার টাকা উৎসে কর কাটা হয়েছে। কিন্তু সব ধরনের কর ছাড় ও হিসাব শেষে তার প্রকৃত করদায় দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার টাকা। সে ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাটা ১০ হাজার টাকা সরকার ফেরত দেবে।
তবে এই অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যাবে না। করদাতাকে অবশ্যই আয়কর রিটার্ন জমা দিয়ে সেখানে ব্যাংক হিসাব নম্বর উল্লেখ করে কর ফেরতের আবেদন করতে হবে। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে কর কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে পাঠাবে। বর্তমান বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকলে ১২০ দিনের মধ্যে অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা।
কর সমন্বয় বা অর্থ ফেরতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কাটা উৎসে করের প্রত্যয়নপত্র। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর ইতোমধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেটে রাখা উৎসে করের প্রত্যয়নপত্র বিতরণ শুরু করেছে। জেলা সঞ্চয় অফিস, ব্যুরো ও বিশেষ ব্যুরো অফিস থেকে এই সনদ সংগ্রহ করা যাচ্ছে। আয়কর রিটার্নের সঙ্গে এই প্রত্যয়নপত্র সংযুক্ত করতে হবে। এটিই উৎসে কর কাটা হওয়ার সরকারি প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
নতুন নিয়মের ফলে অনেক ছোট বিনিয়োগকারীও প্রথমবারের মতো আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার মুখে পড়তে পারেন। যাদের করযোগ্য আয় নেই, কিন্তু সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে উৎসে কর কাটা হয়েছে, তারা সেই অর্থ ফেরত পেতে চাইলে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, ১০ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন বাধ্যতামূলক। ফলে টিআইএনধারী অনেক ব্যক্তি, যাদের প্রকৃত করদায় নেই, তারাও কেটে রাখা কর ফেরত পাওয়ার জন্য রিটার্ন জমা দিতে পারেন।
সরকার আগামী জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের জন্য সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার অপরিবর্তিত রেখেছে। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ মুনাফার হার প্রায় ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। মধ্যবিত্ত ও অবসরপ্রাপ্ত মানুষের সঞ্চয়ের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এই হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
শুধু কর সমন্বয়ের নিয়মেই পরিবর্তন আসেনি। সঞ্চয়পত্র, জীবন বীমা ও ডিপিএসসহ বিভিন্ন অনুমোদিত বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াত কমানোর প্রস্তাবও করা হয়েছে। বর্তমান নিয়মে অনুমোদিত বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কর রেয়াত পাওয়া যায় এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ এই সুবিধার আওতায় থাকে।
নতুন প্রস্তাবে কর রেয়াতের হার ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং সর্বোচ্চ বিনিয়োগসীমা ১০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সাড়ে সাত লাখ টাকা করার কথা বলা হয়েছে অর্থাৎ একই পরিমাণ বিনিয়োগ করলেও আগের তুলনায় কর ছাড় কম পাওয়া যাবে।
তবে কর রেয়াতের আওতাভুক্ত খাতগুলো অপরিবর্তিত থাকছে। সঞ্চয়পত্র, জীবন বীমা ও ডিপিএসে আগের মতোই কর রেয়াত মিলবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ডিপিএসে বছরে সর্বোচ্চ এক লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ওপরও আগের নিয়ম বহাল থাকবে।
আগে ১০ লাখ টাকার কম সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ থাকলে মুনাফার ওপর ৫ শতাংশ উৎসে কর কেটে সেটিকেই চূড়ান্ত কর হিসেবে ধরা হতো। নতুন ব্যবস্থায় সেই সুবিধা আর থাকছে না। এখন সঞ্চয়পত্রের সুদ মোট আয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে। ফলে কোনো ব্যক্তির করস্ল্যাব যদি ১০ শতাংশ বা তার বেশি হয়, তাহলে তাকে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করতে হতে পারে অর্থাৎ ৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রধারী হলেও, তার মোট আয় বেশি হলে আগের তুলনায় করের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।
আগে রিটার্ন দিলে মিলবে কর প্রণোদনা:
এবার থেকে পুরো বছরজুড়েই আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে। তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে করদাতারা প্রণোদনা পাবেন। ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে নির্ধারিত করের ওপর ৫ শতাংশ কর প্রণোদনা মিলবে, তবে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।
১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে কোনো প্রণোদনা বা জরিমানা থাকবে না। ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে রিটার্ন দিলে নির্ধারিত করের ওপর ২ শতাংশ জরিমানা দিতে হবে, যার সর্বোচ্চ সীমা ৩ হাজার টাকা।
আর ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে ৫ শতাংশ জরিমানা আরোপ হবে, তবে তা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। নতুন করদাতাদের জন্য রিটার্ন দাখিলের শেষ সময় আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
অনলাইন রিটার্নে আসছে নতুন ব্যবস্থা:
নতুন অর্থবছর শুরু হলেও এখনও ব্যক্তি করদাতাদের জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিল কার্যক্রম শুরু হয়নি। গত অর্থবছরে পাঁচটি নির্দিষ্ট শ্রেণি ছাড়া প্রায় সব ব্যক্তি করদাতার জন্য অনলাইনে রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হয়। এবার সেই ব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
চলতি অর্থবছর থেকে ব্যক্তি করদাতাদের পাশাপাশি কোম্পানি বা করপোরেট করদাতাদের জন্যও প্রথমবারের মতো অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতি চলছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ করতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে ব্যক্তি করদাতাদের জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের কার্যক্রম চলতি জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে শুরু হতে পারে বলে এনবিআরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, যাদের সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে নিয়মিত উৎসে কর কাটা হয়েছে কিন্তু প্রকৃত করদায় কম, তারা নতুন ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন। কারণ অতিরিক্ত কাটা কর ফেরত নেওয়ার সুযোগ এখন তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে যাদের আয় বেশি এবং সঞ্চয়পত্র থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সুদ আসে, তাদের অনেকের করদায় বাড়তে পারে। পাশাপাশি বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াত কমে যাওয়ায় উচ্চ আয়ের করদাতাদের কর সাশ্রয়ের সুযোগও সীমিত হবে।
তাই আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে সঞ্চয়পত্রের উৎসে করের প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ, আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব প্রস্তুত এবং কর সমন্বয়ের বিষয়টি ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সঠিকভাবে রিটার্ন দাখিল করলে অনেকেই অতিরিক্ত কাটা কর ফেরত পেতে পারেন, আবার ভুল হিসাবের কারণে অতিরিক্ত কর পরিশোধের ঝুঁকিও এড়ানো সম্ভব।

