ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু হওয়ার আগেই দেশের বেসরকারি ও রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থাগুলো বড় ধরনের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বাড়তে থাকা যাত্রী চাহিদা এবং নতুন অবকাঠামোর সুযোগ কাজে লাগাতে ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের চারটি এয়ারলাইনের সম্মিলিত উড়োজাহাজ বহর ৫১টি থেকে বেড়ে ৯১টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মূল ভূমিকা রাখবে লিজ বা ইজারায় আনা ৪০টি নতুন উড়োজাহাজ। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, এয়ার অ্যাস্ট্রা এবং নভোএয়ার—এই চার প্রতিষ্ঠানই নিজেদের বহর সম্প্রসারণে বড় বিনিয়োগের পথে হাঁটছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে দেশের বিমান চলাচল খাতে নতুন গতি তৈরি হবে। দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে দেশীয় এয়ারলাইনগুলো যে সুযোগ হারিয়েছে, নতুন টার্মিনালের মাধ্যমে তা কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বর্তমান টার্মিনাল বছরে প্রায় ৮০ লাখ যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে যাত্রী সংখ্যা অনেক আগেই সেই সীমা ছাড়িয়েছে। ২০২৫ সালে এ বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করেছেন প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ যাত্রী। এর আগে ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ এবং ২০২৩ সালে ছিল প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে বছরে অতিরিক্ত ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা যুক্ত হবে। পাশাপাশি প্রায় ৫ লাখ টন পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হবে। চলতি বছরের ১৬ ডিসেম্বর অথবা ২০২৭ সালের শুরুতে টার্মিনালটি চালুর লক্ষ্য রয়েছে।
দেশীয় এয়ারলাইনগুলো সম্প্রসারণে জোর দিচ্ছে মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার জন্য। বর্তমানে বাংলাদেশে ৩৮টি বিদেশি এয়ারলাইন পরিচালনা করছে। আন্তর্জাতিক রুটের প্রায় ৬৫ শতাংশ যাত্রী বাজার এখনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর দখলে। এভিয়েশন বিশ্লেষক ও বিমানের সাবেক পরিচালনা পর্ষদ সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী এক দশকে ঢাকা হয়ে যাত্রী চলাচল প্রায় দ্বিগুণ হয়ে আড়াই কোটিতে পৌঁছাতে পারে। তার মতে, ভবিষ্যতের এই চাহিদা পূরণে বড় বহর তৈরি করা এখন আর শুধু উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং ব্যবসায়িক প্রয়োজন।
বড় বহর গড়ছে বিমান বাংলাদেশ:
রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ২০২৭ সালের মধ্যে তাদের বহর ২৯টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে। বর্তমানে থাকা বহরের সঙ্গে আরও ১০টি উড়োজাহাজ লিজে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন উড়োজাহাজ কেনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আগে সাময়িক প্রয়োজন মেটাতেই লিজের মাধ্যমে উড়োজাহাজ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিমান।
২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে সরবরাহের লক্ষ্যে বোয়িংয়ের ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার জন্য প্রায় ৩৭০ কোটি ডলারের যে পরিকল্পনা রয়েছে, তার সঙ্গে এই লিজ প্রক্রিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।
২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে তিনটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার ছয় বছরের জন্য লিজ নেওয়ার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে বিমান। পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ বর্তমানে ২২টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ভবিষ্যতে পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার রুটে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি এয়ারলাইন ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স বর্তমানে ২৫টি উড়োজাহাজ পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটি আরও ২১টি বোয়িং ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ লিজে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তাদের বহর ৮৪ শতাংশ বাড়বে। এতে সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার।
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটকে আঞ্চলিক বিমান চলাচলের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। ইউএস-বাংলার মুখপাত্র কামরুল ইসলাম জানান, চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ঢাকাকেন্দ্রিক যাত্রীর চাপ কমবে।
প্রাথমিকভাবে জেদ্দা, মদিনা, বাহরাইন, হংকং, কলম্বো, কাঠমান্ডু ও জোহর বাহরুর মতো গন্তব্যে ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। পাশাপাশি ইউরোপ, কানাডার টরন্টো এবং অস্ট্রেলিয়ার সিডনিকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে।
বর্তমানে চারটি এটিআর ৭২-৬০০ টার্বোপ্রপ উড়োজাহাজ পরিচালনা করা এয়ার অ্যাস্ট্রা তাদের বহর ১০টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে। প্রতিষ্ঠানটি আরও দুটি টার্বোপ্রপ উড়োজাহাজ যুক্ত করার পাশাপাশি ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে চারটি লিজ নেওয়া বোয়িং ৭৭৭ উড়োজাহাজ দিয়ে বড় আকারের আন্তর্জাতিক কার্যক্রমে প্রবেশ করতে চায়। নেপাল, কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুর রুটে ফ্লাইট চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে এয়ার অ্যাস্ট্রা।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান আসিফ বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল দেশের এভিয়েশন খাতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে বদলে দিয়েছে। এতদিন টার্মিনাল ও পার্কিং সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে বহর বাড়ানো কঠিন ছিল। তার মতে, এখন দেশীয় এয়ারলাইনগুলো সক্ষমতা না বাড়ালে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করবে।
কয়েক বছর ধরে লিজের উড়োজাহাজ সংগ্রহে সমস্যায় থাকা নভোএয়ার আবারও সম্প্রসারণের পথে ফিরছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান জানিয়েছেন, চলতি বছরের নভেম্বর বা ডিসেম্বরের মধ্যে দুটি লিজের উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর প্রায় ছয় মাস পর আরও একটি উড়োজাহাজ যুক্ত করা হবে। বর্তমানে তিনটি উড়োজাহাজ নিয়ে পরিচালিত নভোএয়ার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রুটে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর সম্ভাবনা যাচাই করছে।
এভিয়েশন খাতের কর্মকর্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ লিজদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বাংলাদেশের অবস্থান আগের চেয়ে শক্ত হয়েছে। দেশে কোনো উড়োজাহাজ বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঘটনা না থাকা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি এবং কেপটাউন কনভেনশন বাস্তবায়নের কারণে আন্তর্জাতিক লিজদাতারা বাংলাদেশকে তুলনামূলক নিরাপদ বাজার হিসেবে দেখছে।
তবে ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকছে অবকাঠামো সক্ষমতা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলেও দীর্ঘমেয়াদে বাড়তে থাকা যাত্রী চাপ সামলাতে একটি মাত্র রানওয়ে যথেষ্ট নাও হতে পারে। এভিয়েশন খাতের এই দ্রুত সম্প্রসারণ ধরে রাখতে হলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিমানবন্দর ও আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন হবে।

