বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে মানুষের কেনাকাটার অভ্যাস। সময় বাঁচানো, পণ্যের বৈচিত্র্য, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও সহজ সেবার কারণে বাড়ছে আধুনিক খুচরা বাজার বা সুপারমার্কেটের জনপ্রিয়তা। এরই ধারাবাহিকতায় মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দেশে সুপারমার্কেট চেইন আউটলেটের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ২০২৫ ও ২০২৬ সালের ‘এক্সপোর্টার গাইড অ্যানুয়াল’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে দেশে সুপারমার্কেট চেইন আউটলেটের সংখ্যা ছিল ৭৫০টির বেশি। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫০০টির বেশি। একই সময়ে ছোট আকারের আধুনিক খুচরা দোকানের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে এ ধরনের দোকান ছিল প্রায় ১ হাজারটি, ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি।
ইউএসডিএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আধুনিক খাদ্য খুচরা বাজারের এই সম্প্রসারণের ফলে খাতটির বার্ষিক লেনদেনও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালে এ খাতের বাজার আকার দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৮০০ মিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের ৬০০ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ বেশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুপারমার্কেট, কনভেনিয়েন্স স্টোর এবং অনলাইনভিত্তিক খাদ্য বিক্রয় ব্যবসার প্রসার ঘটছে মূলত ভোক্তাদের পরিবর্তিত চাহিদার কারণে। এখন ক্রেতারা শুধু পণ্য কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; তারা কেনাকাটার পরিবেশ, পণ্যের উপস্থাপন, আরামদায়ক সেবা এবং এক জায়গায় বিভিন্ন ধরনের পণ্য পাওয়ার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তবে আধুনিক খুচরা বাজার বাড়লেও দেশের মোট শহুরে খুচরা বিক্রির বড় অংশ এখনো প্রচলিত বাজারনির্ভর। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে আধুনিক রিটেইল প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশীদারত্ব শহুরে খুচরা বাজারের মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ।
ইউএসডিএ বলছে, আধুনিক খুচরা প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ কাঁচাবাজারের তুলনায় নিজেদের আলাদা অবস্থান তৈরি করতে চেষ্টা করছে। উন্নতমানের পণ্য, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং গ্রাহকবান্ধব সেবার মাধ্যমে তারা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শীর্ষ ১০টি আধুনিক খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বপ্ন, আগোরা, মীনা বাজার, ইউনিমার্ট, ডেইলি শপিং, মেট্রো মার্ট, প্রিন্স বাজার, ফ্রেশ সুপার মার্ট, চালডাল ও পান্ডামার্টের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আধুনিক খুচরা বাজারে ভ্যাট সংক্রান্ত নিয়ম সহজ করার উদ্যোগও এ খাতের প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউএসডিএ। তবে এই খাতের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা, খাদ্য সংরক্ষণ, প্যাকেজিং এবং পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এখনো বড় বাধা হিসেবে রয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে অনলাইনভিত্তিক খাদ্য ও নন-ফুড রিটেইল ব্যবসাও দ্রুত বাড়ছে। ইউএসডিএ মনে করছে, ভবিষ্যতে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও ই-কমার্স এই খাতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শুধু খুচরা বাজার নয়, দেশের হোটেল ও রেস্তোরাঁ খাতেও প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেটের মতো শহরে এ খাতের বিস্তার বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি অনুমোদিত আন্তর্জাতিক চেইন, স্থানীয় হোটেল ও রিসোর্ট মিলিয়ে ৫৩টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি পাঁচ তারকা, ৮টি চার তারকা এবং ২৫টি তিন তারকা মানের হোটেল।
ইউএসডিএর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ১ হাজারের বেশি খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের এই খাত বছরে গড়ে ৮ শতাংশ হারে বাড়ছে। নিরাপদ, মানসম্পন্ন ও উন্নত খাদ্যপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধিই এই প্রবৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের আধুনিক রিটেইল ও হসপিটালিটি খাতের বিকাশ বিদেশি খাদ্যপণ্য রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে। বিশেষ করে ভোক্তাপণ্য ও পানীয় খাতে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের বাজার সম্ভাবনা বাড়ছে।
তবে বাংলাদেশে ভোক্তাপণ্য আমদানির তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশ এখনো খুব সীমিত। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ এ ধরনের পণ্য আমদানি করেছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে মাত্র ১৩ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার।

