দেশের দরিদ্র ও অসহায় পরিবারগুলোর জন্য সরকারের বড় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে এখনো বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্ত করা। নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার না থাকায় বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও কারা প্রকৃত সুবিধা পাওয়ার যোগ্য, তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক তথ্যের অভাবে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দ করা সুবিধার একটি অংশ তুলনামূলক সচ্ছল মানুষের কাছে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, আবার অনেক প্রকৃত দরিদ্র পরিবার সহায়তার বাইরে থেকে যেতে পারে।
ক্ষমতাসীন বিএনপির অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল ফ্যামিলি কার্ড চালু করা। সরকার গঠনের পর দেশের অসচ্ছল পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে দ্রুত এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে উপকারভোগী নির্বাচন নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় কার্যক্রম পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। এই সমস্যা সমাধানে সমাজসেবা অধিদপ্তর (ডিএসএস) তিন মাসের মধ্যে সারাদেশে একটি গণনা কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে। এ জন্য ৬০ হাজারের বেশি গণনাকারী নিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রস্তাব নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, মাত্র তিন মাসের মধ্যে সারাদেশের সব পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা বাস্তবসম্মত নয়। তারা বলছেন, বড় ধরনের গণনা বা জরিপ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞ জনবল, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং আইনি কাঠামো সমাজসেবা অধিদপ্তরের রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জরিপ পরিচালনা করতে পারে। তবে যেসব এলাকায় বিবিএসের নিজস্ব কার্যক্রম নেই, মূলত সেসব ক্ষেত্রেই অন্য সংস্থার জরিপ করার সুযোগ রয়েছে।
চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর আওতায় ৪১ লাখ পরিবারকে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মসূচিটি বাস্তবায়নের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর চলমান ‘সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা, সহনশীলতা বৃদ্ধি, অন্তর্ভুক্তি ও সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ’ প্রকল্প সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছে। এতে প্রস্তাবিত গণনা কার্যক্রম, তথ্য সংগ্রহ ও উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়া যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসে ফ্যামিলি কার্ডের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়। কয়েক মাসের পাইলট কার্যক্রম সফলভাবে শেষ হওয়ার পর ১ জুলাই থেকে সারাদেশে কর্মসূচিটি চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
দেশের দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার তৈরির উদ্যোগ দীর্ঘদিনের। জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৭ বছর আগে অতিদরিদ্র, অসহায় প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার তৈরির ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরবর্তী বাজেট বক্তৃতায় তিনি জানিয়েছিলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগীদের তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে। তবে এত বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশে এখনো কার্যকর ও ব্যবহারযোগ্য একটি দারিদ্র্য তথ্যভান্ডার তৈরি হয়নি।
দরিদ্র পরিবার শনাক্ত করতে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জাতীয় খানা তথ্যভান্ডার তৈরির প্রকল্প হাতে নেয়। এতে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি পরিবারের তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩২৯ কোটি টাকা এবং ২০১৭ সালে এটি শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় প্রকল্প শেষ হয় ২০২২ সালে। এ সময় ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৭২৭ কোটি টাকায়।
তবে তথ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি (এমআইএস) এবং অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) তৈরি না হওয়ায় এই তথ্যভান্ডার এখনো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ২০২৪ সালে প্রকল্প সংশোধনের সময় বিবিএস স্বীকার করে, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা না থাকায় দারিদ্র্য তথ্যভান্ডার ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় নেই।
চলতি অর্থবছরের সামাজিক নিরাপত্তা বাজেট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার না থাকায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচনে এখনো বড় ধরনের ভুল রয়ে গেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশের দরিদ্র পরিবারের মাত্র অর্ধেকের মতো সামাজিক সহায়তা পেয়েছে। অন্যদিকে মোট সামাজিক সুবিধার প্রায় ২২ শতাংশ গেছে দেশের সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের কাছে। এতে বোঝা যায়, একদিকে প্রকৃত দরিদ্ররা বাদ পড়ছে, অন্যদিকে যাদের প্রয়োজন কম তারাও বিভিন্ন সুবিধা পাচ্ছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এত বছর পরও দরিদ্র মানুষের পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার না থাকা অত্যন্ত হতাশাজনক। তিনি বলেন, নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডারের অভাবে সরকারি অর্থ সঠিক জায়গায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে সুবিধার একটি বড় অংশ সচ্ছল মানুষের কাছে চলে যেতে পারে এবং অনেক দরিদ্র মানুষ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
তিনি পরামর্শ দেন, ফ্যামিলি কার্ড চালুর আগে মানসম্মত জরিপ বা গণনার মাধ্যমে একটি নির্ভুল তথ্যভান্ডার তৈরি করা প্রয়োজন। এ ধরনের কাজ সাধারণত বিবিএস করে থাকে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে যুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব বলেন, বিবিএস বিভিন্ন ধরনের জরিপ পরিচালনা করলেও ফ্যামিলি কার্ডের প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন করার জন্য সেসব তথ্য যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, এ কারণে সমাজসেবা মন্ত্রণালয়কে গণনা ও তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই কাজের জন্য সারাদেশে জনবল নিয়োগ করা হবে এবং পর্যবেক্ষণ দল গঠন করা হবে। তার দাবি, দেশের সব পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করে তিন মাসের মধ্যেই গণনা ও উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ করা হবে।
তবে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মো. ফিরোজ সরকার জানিয়েছেন, সমাজসেবা অধিদপ্তর এখনো কোনো গণনা বা জরিপের বিস্তারিত পরিকল্পনা তাদের কাছে দেয়নি। তিনি বলেন, বরং সমাজসেবা অধিদপ্তর মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা যাচাইয়ের জন্য প্রক্সি মিনস টেস্ট (পিএমটি) পদ্ধতি ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। এই পদ্ধতিতে সরাসরি আয় নয়, বরং বিভিন্ন সূচকের মাধ্যমে একটি পরিবারের আর্থিক অবস্থার ধারণা নেওয়া হয়।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে সমাজসেবা অধিদপ্তর কোনো বড় ধরনের জরিপ বা গণনা কার্যক্রম পরিচালনা করলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সহযোগিতা নেবে।

