বিদেশি ঋণ ও অনুদানের মাধ্যমে ১৭টি নতুন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত এসব প্রকল্পের মোট সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৮ হাজার ১৯৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান।
প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) আকারে প্রস্তুত হওয়া এসব প্রকল্প আগামী ২৩ জুলাই অনুষ্ঠেয় ফরেন এইড সার্চ কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। বৈঠকে কোন প্রকল্পের জন্য বিদেশি ঋণ বা অনুদান চাওয়া হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, নগর অবকাঠামো, বস্তি উন্নয়ন, জলবায়ু ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ, রেল যোগাযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রকল্পগুলো তৈরি করা হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩২ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। লক্ষ্য হলো অবকাঠামো উন্নয়ন, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে টেকসই সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
এসব প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য সরকার বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি), ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইএসডিবি), জাইকা, কোইকা, ইউএনডিপি, সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্টসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। ইআরডি জানিয়েছে, কয়েকটি প্রকল্পে ইতোমধ্যে সম্ভাব্য অর্থদাতাদের আগ্রহ পাওয়া গেছে। অন্যগুলোর জন্য উপযুক্ত উন্নয়ন সহযোগী বেছে নেবে ফরেন এইড সার্চ কমিটি।
নতুন বড় প্রকল্প গ্রহণে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা। তার মতে, নতুন মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে চলমান ও অসমাপ্ত প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করাই বেশি প্রয়োজন। এতে উন্নয়নের সুফল দ্রুত মিলবে এবং অর্থায়নের চাপও কিছুটা কমবে।
তিনি আরও বলেন, যেসব প্রকল্পে অনুদানের অংশ বেশি, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো মানবসম্পদভিত্তিক খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বড় অবকাঠামোর পাশাপাশি তুলনামূলক ছোট কিন্তু লক্ষ্যভিত্তিক প্রকল্পেও নজর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
ইআরডি কর্মকর্তাদের মতে, বিদেশি অর্থায়নের জন্য কোনো প্রকল্প প্রথমে পরিকল্পনা কমিশনের নীতিগত অনুমোদন পায়। এরপর প্রকল্পটি ইআরডিতে পাঠানো হয়, যেখানে বিদেশি সহায়তার উপযোগিতা যাচাই করা হয়। পরে ফরেন এইড সার্চ কমিটি প্রকল্পের ধরন অনুযায়ী সবচেয়ে উপযুক্ত উন্নয়ন সহযোগী নির্বাচন করে। তবে অনেক সময় নির্দিষ্ট অর্থদাতা প্রতিষ্ঠানের অগ্রাধিকার ও শর্ত বিবেচনায় রেখেও প্রকল্পের নকশা তৈরি করা হয়, যাতে অর্থায়নের সম্ভাবনা বাড়ে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাংলাদেশ মোট ৪.৭৯৪ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। এর মধ্যে ১.৫৬৪ বিলিয়ন ডলার ছিল বাজেট সহায়তা। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ বিলিয়নের বেশি নতুন প্রতিশ্রুতি পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এ জন্য বাজেটে বৈদেশিক সহায়তা বাবদ ৪৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত নতুন ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পটি আবারও সামনে এসেছে। আগে প্রকল্পটি ভারতের লাইন অব ক্রেডিটের আওতায় বাস্তবায়নের কথা থাকলেও দীর্ঘসূত্রতার কারণে তা এগোয়নি। গত বছর সরকার পরিবর্তনের পর ভারতীয় ঋণনির্ভর কয়েকটি প্রকল্প থেকে সরে এসে বিকল্প অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বর্তমানে এআইআইবি প্রকল্পটিতে অর্থায়নে আগ্রহ দেখিয়েছে। পাশাপাশি এডিবি ও আইএসডিবির কাছেও ঋণ প্রস্তাব পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। যে সংস্থা সবচেয়ে সহজ শর্তে ঋণ দেবে, তাদের অর্থায়নেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় বেড়ে প্রায় ৮৪৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০১৮ সালে অনুমোদনের সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৪৫৩ মিলিয়ন ডলার।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন করাইল, সাততলা ও ভাসানটেক এলাকায় বস্তি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রায় ৯৬০ মিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পের মাধ্যমে নিরাপদ পানি, আধুনিক পয়োনিষ্কাশন, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ সড়ক উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য এবং নগর পরিবেশের উন্নয়ন করা হবে।
এছাড়া ২০২৬ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৪৫ মিলিয়ন ডলারের কল্যাণপুর খাল উন্নয়ন প্রকল্পও প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে জলাবদ্ধতা নিরসন, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল পুনরুদ্ধার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার বিভাগ সারা দেশে সবুজ ও জলবায়ু সহনশীল নগর অবকাঠামো গড়ে তুলতে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত চলার কথা থাকা এ প্রকল্পে প্রায় দেড় কোটি শহুরে দরিদ্র মানুষ উপকৃত হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) ঢাকার টেকনিক্যাল টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে একটি ভাষা ল্যাব ও অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে। ৩১ কোটি ২৫ লাখ টাকার এই প্রকল্পে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষার দক্ষতা এবং আধুনিক গাড়ি প্রযুক্তি বিষয়ে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
এদিকে ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ড প্রায় ১ হাজার ১৩ কোটি টাকার “লেভারেজিং রেমিট্যান্স ইন বাংলাদেশ” প্রকল্পের প্রস্তাব করেছে। এর লক্ষ্য হলো কম খরচে রেমিট্যান্স পাঠানোর সুযোগ বাড়ানো, আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রবাসীদের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা।
বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ দেশের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাত শক্তিশালী করতে প্রায় ১৫.৭ মিলিয়ন ডলারের একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। এতে কোইকা প্রায় ১২.৯ মিলিয়ন ডলার অনুদান দেবে এবং বাকি অর্থ সরকার বহন করবে। দক্ষিণ কোরিয়া ইতোমধ্যে প্রাথমিকভাবে অর্থায়নে সম্মতি দিয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) চারটি অনুদানভিত্তিক গবেষণা প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বর্জ্য বায়োমাস থেকে সার উৎপাদন, মাছের বর্জ্য থেকে রপ্তানিযোগ্য উচ্চমূল্যের জৈব উপাদান তৈরি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও তাপপ্রবাহের ঝুঁকি মূল্যায়ন।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর বাগেরহাটে মংলা নদীর ওপর মংলা সেতু নির্মাণে প্রায় ১৩৯.৯৫ মিলিয়ন ডলারের বিদেশি অর্থায়ন চাচ্ছে। বিদ্যমান ফেরি পারাপারের বিকল্প হিসেবে স্থায়ী সেতুটি নির্মাণ করা হলে যোগাযোগ আরও সহজ হবে।
এদিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) গ্রামীণ সড়কে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণের জন্য প্রায় ২৭৪.৯৪ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট প্রাথমিকভাবে অর্থায়নে সম্মতি দিয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩২ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

