দেশের শিল্পায়ন, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অবস্থিত বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল। প্রচলিত তৈরি পোশাক ও জুতা শিল্পের বাইরে গিয়ে এই অঞ্চল এখন উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর ও মূল্য সংযোজনকারী পণ্য উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে। ড্রোন, ওষুধশিল্পের কাঁচামাল (এপিআই), ব্যাটারি প্লেট, আউটডোর সরঞ্জামসহ বিভিন্ন আধুনিক পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের শিল্প খাতে নতুন মাত্রা যোগ করছে অঞ্চলটি।
ইতোমধ্যে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, শ্রীলঙ্কা ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছেন। তবে সম্ভাবনার এই বড় শিল্পাঞ্চলের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাস সরবরাহ সংকট। প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় নতুন বিনিয়োগের গতি যেমন ধীর হচ্ছে, তেমনি প্রস্তুত কারখানাগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারছে না। ফলে একদিকে বাড়ছে বিনিয়োগের আগ্রহ, অন্যদিকে জ্বালানি সংকটে আটকে যাচ্ছে শিল্প সম্প্রসারণের গতি।
বেপজার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মিরসরাইয়ের এই বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৩০২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। তবে কঠোর আর্থিক ব্যবস্থাপনার কারণে মূল বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ১৬৩ কোটি টাকা কম খরচে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)। অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে রয়েছে মোট ৫৩৯টি শিল্প প্লট এবং দুটি আধুনিক ছয়তলা কারখানা ভবন। এর মধ্যে ৩৬০টি প্লট এবং একটি কারখানা ভবন ইতোমধ্যে ৫৯টি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
মিরসরাই বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। সর্বশেষ গত ১৬ জুলাই চীনের প্রতিষ্ঠান ‘হুয়ারুন টেক্স কোম্পানি লিমিটেড’ ৩০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে একটি টেক্সটাইল কারখানা স্থাপনের জন্য বেপজার সঙ্গে জমি ইজারা চুক্তি করেছে।
এ নিয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে এখন পর্যন্ত ৬৩টি প্রতিষ্ঠান জমি ইজারা চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পাশাপাশি আরও ৪০টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এখানে বিনিয়োগের জন্য বেপজার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইতোমধ্যে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের ১২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক উৎপাদনে গেছে এবং বিশ্ববাজারে পণ্য রপ্তানি শুরু করেছে। আরও তিনটি প্রতিষ্ঠান পরীক্ষামূলক উৎপাদন চালাচ্ছে।
রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে এগিয়ে রয়েছে চীনা মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘কাইজি লঞ্জারি বাংলাদেশ’। প্রতিষ্ঠানটি ১৮ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এরই মধ্যে তারা ৩৪ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি ৩ হাজার ৬৫১ জন বাংলাদেশি নাগরিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রথম রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘কেপিএসটি শুজ (বিডি)’ ফুটওয়্যার অ্যাকসেসরিজ রপ্তানি করে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত ৯ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।
এ ছাড়া মিংদা (বাংলাদেশ) নিউ ম্যাটেরিয়াল, ফেংকুন কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল, জিবিন টেকনোলজি, তাইশেং (বাংলাদেশ) ওয়েবিং এবং ভারনন অ্যান্ড অলিভার ফার্নিচারের মতো আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানও উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
বিনিয়োগের এই সম্ভাবনার মধ্যেই বড় উদ্বেগ হয়ে দেখা দিয়েছে গ্যাস সংকট। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, অনেক কারখানা অবকাঠামো প্রস্তুত করলেও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে পারছে না।
তাদের দাবি, বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডার পাওয়ার পরও জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ১৫টি প্রতিষ্ঠান বিকল্প ব্যবস্থায় উৎপাদন ও রপ্তানি চালু রেখেছে। তবে গ্যাসের অভাবে এসব কারখানা তাদের প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকও কাজে লাগাতে পারছে না।
বেপজার নির্বাহী পরিচালক (বিনিয়োগ উন্নয়ন) মো. তানভীর হোসেন বলেন, মিরসরাই বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ অত্যন্ত বেশি। গ্যাস সংযোগ পুরোপুরি নিশ্চিত করা গেলে বর্তমানের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বিনিয়োগ দ্রুত আনা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ চলছে বলেও জানান তিনি।
গ্যাস সংকটের পাশাপাশি কাস্টমস সেবার জটিলতাকেও বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন বিনিয়োগকারীরা। অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে পূর্ণাঙ্গ ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল কাস্টমস সুবিধা না থাকায় আমদানি-রপ্তানির ছোটখাটো কাজের জন্যও উদ্যোক্তাদের বাইরে কাস্টমস হাউসে যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও ব্যয় বাড়ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য সরবরাহের নির্ধারিত সময় বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
বেপজার কর্মকর্তারা মনে করছেন, গ্যাস সরবরাহ ও কাস্টমস সেবার সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা গেলে মিরসরাই বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল দেশের অন্যতম বড় শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। তাদের হিসাবে, অঞ্চলটি পুরোপুরি চালু হলে প্রায় ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবছর ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের বৈচিত্র্যময় পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব হবে।
এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়বে, ডলার সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করবে এবং রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে, যা দেশের শিল্প খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করবে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ও দ্রুত কাস্টমস সেবা নিশ্চিত করা।

