সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ঘোষিত নবম বেতনকাঠামো বাস্তবায়নকে ঘিরে কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি সরকার। একদিকে অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর আপত্তি এবং একই সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা—এই তিন দিকের চাপ সামলেই নতুন পে-স্কেল কার্যকর করতে হচ্ছে সরকারকে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আগের অন্তর্বর্তী সরকার নতুন বেতনকাঠামো ঘোষণা করলেও তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন বর্তমান সরকারের ওপর। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকরের ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে কবে এটি কার্যকর হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থ কোথা থেকে আসবে, বাজেটের কোন খাত থেকে কত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব, অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব কী হবে এবং সরকারের আর্থিক চাপ কতটা বাড়বে—এসব বিষয় নিয়ে কয়েক দফায় বৈঠক করছেন নীতিনির্ধারকেরা।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থসচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন এবং সম্ভাব্য আর্থিক সীমাবদ্ধতার বিষয়ও ব্যাখ্যা করেন।
সূত্র জানায়, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি এটি ধাপে ধাপে কার্যকর করার বিষয়েও আলোচনা হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর আপত্তি, চলতি বাজেটে রাখা বরাদ্দের পর্যাপ্ততা এবং সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়ও পর্যালোচনা করা হয়।
সরকারের হিসাবে, নতুন পে-স্কেলের আওতায় প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কয়েক লাখ পেনশনভোগী অন্তর্ভুক্ত হবেন। ফলে বেতন ব্যয়ের পাশাপাশি পেনশন খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। সরকারি সূত্র বলছে, উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের নির্দেশনা অনুযায়ী সচিব কমিটি আগের ঘোষিত বেতনকাঠামোয় কিছু পরিবর্তন এনে একটি চূড়ান্ত প্রস্তাব প্রস্তুত করছে। পরে সেটি মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।
এদিকে সরকারের আর্থিক পরিস্থিতিও নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছ থেকে নতুন ঋণ পাওয়ার চেষ্টা চলছে। একই সময়ে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রায় এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়েছে, যা সংস্থাটির ইতিহাসে অন্যতম বড় ঘাটতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা এবং জ্বালানি সংকট দেশের শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের ঘাটতির কারণে ইতোমধ্যে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আরও অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
এ অবস্থায় সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ বলেন, বর্তমান সরকারের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন না করার সুযোগ খুবই সীমিত। কারণ বিষয়টি নির্বাচন-পূর্ব সময় থেকেই আলোচনায় ছিল এবং সরকার নিজেই চলতি বাজেটে এটি অন্তর্ভুক্ত করেছে। ফলে আর্থিক চাপ থাকলেও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথ খুঁজতে হবে। অন্যদিকে নতুন বেতনকাঠামোর ব্যয় কীভাবে মেটানো হবে, সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ কয়েকটি উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান।
সাম্প্রতিক বৈঠকে আইএমএফ সরকারকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন অন্তত দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে। অর্থ বিভাগের সঙ্গে আলোচনায়ও একই সুপারিশ করা হয়।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় সেই পরামর্শ মানা কঠিন। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি হয়নি। আগের সরকার বেতনকাঠামো ঘোষণা করেছে এবং বর্তমান সরকারও বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এখন এটি পিছিয়ে দেওয়া হলে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আরও জানান, আইএমএফের আপত্তি থাকলেও আগামী অক্টোবরে সংস্থাটির বার্ষিক সভার আগেই নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের বিষয়ে সরকার ইতিবাচকভাবে ভাবছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগামী অক্টোবরে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য আইএমএফের বার্ষিক সভায় নতুন ঋণচুক্তি ও পে-স্কেলের সময়সূচি নিয়ে আবার আলোচনা হতে পারে। এছাড়া নভেম্বরে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করলে বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্রের দাবি, সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সরকার অক্টোবরের আগেই গেজেট প্রকাশ করতে আগ্রহী। একই সঙ্গে আইএমএফের সঙ্গে এ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনায় না গিয়ে দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত জানাতে চায়।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের অর্থনীতি এখনো দুর্বল অবস্থায় রয়েছে এবং এটি ঘুরে দাঁড়াতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে। তবে সব সংকটের মধ্যেও সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন জরুরি। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন বেতন না বাড়লেও এ সময়ে মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি বেতন বৃদ্ধি দুর্নীতি কমাতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
এদিকে সচিবালয়ের কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সদস্যসচিব মো. মাহমুদুল হাসান দ্রুত নবম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, সরকার চাইলে আর্থিক সুবিধা ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করতে পারে, কিন্তু নীতিগত সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হিসেবে গেজেট এখনই জারি করা প্রয়োজন।

