জ্বালানি সংকট ও বাড়তি উৎপাদন খরচের চাপ সত্ত্বেও চলতি অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। এপ্রিল-জুন সময়ে নিট পোশাক রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে প্রায় সাড়ে দশ শতাংশ, যা মূলত নিটওয়্যার রপ্তানির উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির কারণেই সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক পর্যালোচনা অনুযায়ী, এই সময়ে তৈরি পোশাক থেকে নিট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬২৩ কোটি ডলার, যেখানে আগের প্রান্তিকে এই আয় ছিল ৫৬৪ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধির হার প্রায় বিশ শতাংশ, কারণ সে সময় আয় ছিল ৫১৭ কোটি ডলার।
শুধু নিট আয়ই নয়, মোট তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ও আগের প্রান্তিকের তুলনায় প্রায় সাড়ে নয় শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার দশ কোটি ডলারে, যা এক বছর আগের তুলনায় প্রায় সাড়ে দশ শতাংশ বেশি।
খাতভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, নিটওয়্যার রপ্তানি আগের প্রান্তিকের ৪৬১ কোটি ডলার থেকে প্রায় উনিশ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫০ কোটি ডলারে। তবে ওভেন পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল সামান্যই—৪৫৮ কোটি থেকে বেড়ে ৪৬০ কোটি ডলার। মূলত নিটওয়্যারের এই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধিই আগের প্রান্তিকের তুলনামূলক দুর্বল অবস্থান থেকে খাতটিকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে।
শুধু পোশাক খাতই নয়, জুন মাসে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়েও লক্ষণীয় উন্নতি দেখা গেছে। এই মাসে রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় প্রায় ছাব্বিশ শতাংশ বেড়ে চারশ বিশ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। তবে বছরের শেষদিকের এই ইতিবাচক ধারা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ অর্থবছরের হিসাবে মোট রপ্তানি আয়ের সামান্য পতন ঠেকানো যায়নি।
রপ্তানিকারকদের ভাষ্য অনুযায়ী, জুনের এই প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ ছিল আগের বছরের তুলনামূলক নিম্ন ভিত্তি। গত বছর ঈদুল আজহার ছুটি দীর্ঘ হওয়ায় জুনে রপ্তানি কম হয়েছিল, কিন্তু এবার ঈদের ছুটি মূলত মে মাসে পড়ায় জুনে রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতে চলতে পেরেছে।
তবে ত্রৈমাসিক এই পুনরুদ্ধার সত্ত্বেও জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রপ্তানিকারকরা। তাদের আশঙ্কা, আগামী কয়েক মাসে এই সংকট রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সংশ্লিষ্ট একটি বাণিজ্য সংগঠনের সভাপতি জানান, জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি উচ্চ সুদহার এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা আগামী দিনে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিষয়টিও। তবে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করে বলেন, দেশীয় সমস্যাগুলোর সমাধান হলে নতুন অর্থবছরে রপ্তানি পরিস্থিতির আরও উন্নতি সম্ভব।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারের পক্ষ থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে গ্যাস সংকট ইতিমধ্যে বস্ত্র উৎপাদনে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। একটি টেক্সটাইল সংগঠনের সভাপতির ভাষ্যমতে, সংগঠনের হাজার হাজার সদস্য কারখানার একটি বড় অংশ গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির কারণে বন্ধ রয়েছে। শুধু বস্ত্রকল নয়, গ্যাসনির্ভর ইস্পাত, কাগজ ও সিরামিক শিল্পও একই সমস্যায় জর্জরিত বলে তিনি জানান।
মূল্য সংযোজনের দিক থেকে দেখা যায়, চতুর্থ প্রান্তিকে পোশাক খাত প্রায় ৩৮৭ কোটি ডলারের কাঁচামাল আমদানি করেছে, যার মধ্যে ছিল তুলা, সুতা, কাপড় ও বিভিন্ন সহায়ক উপকরণ। এই আমদানি ব্যয় মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় আটত্রিশ শতাংশের সমান, ফলে খাতটিতে মূল্য সংযোজনের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে একষট্টি শতাংশ, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় সামান্য বেশি।
তবে পুরো অর্থবছরের চিত্র তুলনামূলক মন্থর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে মোট আয় হয়েছে প্রায় তিন হাজার আটশ সাতানব্বই কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় মাত্র শূন্য দশমিক ছিয়ানব্বই শতাংশ বেশি। দেশের নামমাত্র মোট দেশজ উৎপাদনে এই খাতের অবদান ছিল প্রায় সাড়ে সাত শতাংশ, যা অর্থনীতিতে খাতটির গুরুত্বই তুলে ধরে।
রপ্তানির প্রধান গন্তব্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা কয়েকটি দেশ এখনো শীর্ষে রয়েছে। চতুর্থ প্রান্তিকে এসব দেশে মোট রপ্তানির প্রায় বাহাত্তর শতাংশ পোশাক রপ্তানি হয়েছে।
এদিকে সংকটকালে পোশাক খাতকে সহায়তা দিতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে রপ্তানি-পূর্ব ঋণ পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি এবং সবুজ রূপান্তরে বিশেষ তহবিলসহ বিভিন্ন সহায়তা তহবিল। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, চাহিদা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা এবং নিয়মনীতি পরিপালনে অগ্রগতির কারণে আগামী দিনগুলোতে পোশাক রপ্তানির সম্ভাবনা মোটামুটি ইতিবাচক থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।

