দেশের আমদানি ব্যবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনল সরকার। নতুন আমদানি নীতি আদেশে ব্যবসায়ীদের জন্য এলসি বা ঋণপত্রের বাইরেও কোনো মূল্যসীমা ছাড়াই পণ্য আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল ও কেন্দ্রীয় বন্ডেড গুদাম স্থাপনের বিধান, প্রবাসীদের শিল্পে বিনিয়োগে বিশেষ সুবিধা এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানির পরিধিও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে এই নতুন নীতিতে, যার মেয়াদ থাকবে ২০২৬ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত।
গত সোমবার (২৪ আগস্ট) বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই নতুন আমদানি নীতির গেজেট প্রকাশ করে। এখন থেকে শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আমদানিকারকরা ঋণপত্রের পাশাপাশি সরাসরি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমেও পণ্য আনতে পারবেন, তাও আবার কোনো নির্দিষ্ট মূল্যসীমার বাধ্যবাধকতা ছাড়াই।
আগের নীতিতেও কিছুটা এই সুযোগ ছিল, তবে তা ছিল সীমিত। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকা আগের নীতিতে বাণিজ্যিক আমদানিকারকরা এলসি ছাড়া নির্দিষ্ট একটি মূল্যসীমার মধ্যেই কেবল পণ্য আনতে পারতেন— বার্ষিক পাঁচ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত, এবং কিছু নির্দিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে ছিল আলাদা সীমা। নতুন নীতিতে সেই সীমাবদ্ধতা পুরোপুরি তুলে দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রচলিত আধুনিক পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
এর ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলে বাধ্যতামূলকভাবে এলসি খোলার প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে এবং আমদানিকারক ও বিদেশি সরবরাহকারীর মধ্যে সরাসরি বাণিজ্যিক চুক্তির সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে আমদানি প্রক্রিয়ায় সময় ও ব্যাংকিং সংক্রান্ত জটিলতা অনেকটাই কমে আসতে পারে।
নতুন নীতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল ও কেন্দ্রীয় বন্ডেড গুদাম প্রতিষ্ঠার বিধান যুক্ত করা। সরকার আশা করছে, এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্য, লজিস্টিকস ও পুনঃরপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাও আরও কার্যকর হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রথমবারের মতো নতুন এই নীতিতে ‘প্রবাসী বাংলাদেশি’র একটি সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে। তাদের অনুমোদিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য মূলধনি যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানির প্রক্রিয়া আগের চেয়ে সহজ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত আধুনিক অর্থ পরিশোধ পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রবাসীদের দেশে শিল্প স্থাপন ও বিনিয়োগে উৎসাহিত করার একটি সুস্পষ্ট প্রয়াস দেখা যাচ্ছে এই নীতিতে।
রপ্তানি খাতের বহুমুখীকরণ এবং উচ্চ মূল্য সংযোজনসম্পন্ন পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনামূল্যে বা ফ্রি অব কস্ট ভিত্তিতে কাঁচামাল ও উৎপাদন উপকরণ আমদানির সুযোগও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে এই সুবিধাকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে, কারণ এতে উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাঁচামাল দ্রুত সংগ্রহ করাও সহজ হবে।
আলোচিত পরিবর্তনগুলোর মধ্যে একটি হলো মোটরসাইকেল আমদানির ক্ষেত্রে ইঞ্জিন ক্ষমতার সীমা বাড়ানো। আগের নীতিতে সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় একশ পঁয়ষট্টি সিসির বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেল আমদানিতে বিধিনিষেধ ছিল। নতুন নীতিতে সেই সীমা বাড়িয়ে তিনশ পঁচাত্তর সিসি পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের মাঝারি ও উচ্চ ক্ষমতার মোটরসাইকেল সরাসরি দেশে আমদানির সুযোগ তৈরি হবে। তবে এই পরিবর্তন দেশীয় মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসার ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
আমদানিকারকদের দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা— পণ্যের এইচএস কোড ও বর্ণনার মধ্যে অসামঞ্জস্য— সমাধানেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে নতুন নীতিতে। এইচএস কোডের বর্ণনাকে চূড়ান্ত ভিত্তি ধরার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যাতে কোড ও পণ্যের প্রকৃত বর্ণনার গরমিলের কারণে আমদানি প্রক্রিয়ায় অহেতুক হয়রানি ও বিলম্ব এড়ানো যায়।
সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ২০২১-২৪ মেয়াদের নীতির মূল লক্ষ্য ছিল আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা এবং রপ্তানিমুখী শিল্পকে সহায়তা দেওয়া। নতুন নীতিতে সেই ধারাবাহিকতা আরও বিস্তৃত করে আমদানি অর্থায়ন, বিনিয়োগ, লজিস্টিকস, পুনঃরপ্তানি এবং প্রবাসী বিনিয়োগ— সবকিছুকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এলসির বাইরে মূল্যসীমাহীন আমদানির সুযোগ ব্যবসায়ীদের জন্য যতটা সুবিধাজনক, ঠিক ততটাই এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে বাড়তি ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা। এলসির বাইরে লেনদেন বাড়লে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, ওভার বা আন্ডার-ইনভয়েসিং এবং অর্থপাচারের মতো ঝুঁকিগুলো ঠেকাতে নজরদারিও আরও জোরদার করতে হবে।
নতুন নীতির শুরুতেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির উল্লেখ রয়েছে, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি বা অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির সঙ্গে আমদানি ব্যবস্থাকে সমন্বয় করার সুযোগ তৈরি করে রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, আগের আমদানি নীতির মেয়াদ ২০২৪ সালের জুনেই শেষ হয়ে গিয়েছিল, তবে নতুন নীতি জারি না হওয়া পর্যন্ত সেই পুরনো নীতিই কার্যকর ছিল এতদিন। সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন হলো, এই নতুন আমদানি নীতি বাংলাদেশের বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরও নমনীয়, আন্তর্জাতিক মানের এবং বিনিয়োগবান্ধব করে তুলবে— তবে এর সুফল কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে যথাযথ তদারকি ও প্রয়োগের ওপর।

