বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ কয়েক বছর পিছিয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রস্তুতির কাজ থামানো উচিত নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, উত্তরণে বিলম্বকে কোনোভাবেই সংস্কার স্থগিত রাখার অজুহাত হিসেবে দেখা যাবে না। বরং অতিরিক্ত সময়কে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পখাতকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, উত্তরণ পিছিয়ে গেলেও বাংলাদেশের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো একই থাকবে। তাই প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা, রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং নীতিগত সংস্কারের কাজ অব্যাহত রাখতে হবে।
তিনি বলেন, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন নিয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এই আবেদন অনুমোদনের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অর্ধেকের বেশি দেশের সমর্থন প্রয়োজন হবে। একই ধরনের আবেদন করেছে নেপালও।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আবেদন অনুমোদনের জন্য বাংলাদেশকে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, জাপান, চীন ও ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগীদের সমর্থন নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। পাশাপাশি ঢাকায় অবস্থানরত উন্নয়ন অংশীদারদের মাধ্যমেও নিজ নিজ দেশের রাজধানীতে বাংলাদেশের পক্ষে ইতিবাচক অবস্থান তৈরির চেষ্টা চলছে।
জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশের আবেদন পর্যালোচনা করে জানায়, সময় বাড়ানোর যৌক্তিক কারণ থাকলেও বাংলাদেশ উত্তরণের জন্য নির্ধারিত তিনটি সূচকেই প্রয়োজনীয় সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে অতিক্রম করেছে। ফলে দেশের উত্তরণের সক্ষমতা নিয়ে তাদের কোনো সন্দেহ নেই।
কমিটির মতে, অতীতে যেসব দেশকে সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও তিন বছরের প্রস্তুতিকাল দেওয়া হয়েছিল। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশের আবেদনও পূর্ববর্তী চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করেছে, প্রয়োজনের তুলনায় দীর্ঘ সময় স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় থাকলে উত্তরণের মাধ্যমে যে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ ও আন্তর্জাতিক আস্থা তৈরি হওয়ার কথা, তা অর্জনেও বিলম্ব হতে পারে।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, সরকার কোনো সুবিধা ধরে রাখার জন্য নয়, বরং উত্তরণকে আরও টেকসই করতে সময় চেয়েছে। তার মতে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া উত্তরণ ঘটলে অর্থনীতিতে স্থবিরতা তৈরি হতে পারে এবং কিছু খাতে নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিতে পারে।
তিনি জানান, উত্তরণের পর কিছু ওষুধ উৎপাদনে পেটেন্ট কিনতে হতে পারে, যার ফলে নির্দিষ্ট ওষুধের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া দেশে পর্যাপ্ত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় আন্তর্জাতিক সংকটের সময় শিল্প খাত ঝুঁকির মুখে পড়ে।
বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের অংশ হিসেবে সরকার একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবসা নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে বলেও জানান তিনি। এই ব্যবস্থা চালু হলে বর্তমানে প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেতে যেখানে ৩৫৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে, তা কমে ১৪ দিনে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। সরকারের আশা, এই কার্যক্রম চলতি বছরের মধ্যেই সম্পন্ন হবে।
পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, উত্তরণের পর ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখতে দ্রুত বাণিজ্য চুক্তির দিকে এগোতে হবে। অন্যথায় ভারতসহ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে শিল্প উদ্যোক্তাদের একটি অংশের মত, শুধু ইউরোপ নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা প্রয়োজন। এতে নতুন বাজার তৈরি হবে এবং রপ্তানির ঝুঁকিও কমবে।
ওষুধশিল্প নিয়েও ইতিবাচক মত দিয়েছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী নেতা। তাদের মতে, উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন উত্তরণ পিছোবে কি না, সেটি নয়; বরং অতিরিক্ত সময়কে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনিক সংস্কার, বাণিজ্য চুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে উত্তরণ-পরবর্তী সময়েও দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী অবস্থানে থাকতে পারবে।

