চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে বড় ধরনের বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস। প্রতিষ্ঠানটি লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের প্রস্তাবিত নকশা ও পরিচালনা পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের শেষ দিকে প্রায় ৫৫ কোটি ডলার ব্যয়ে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু করার লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি হবে বাংলাদেশের প্রথম শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগে নির্মিত কনটেইনার টার্মিনাল। নতুন টার্মিনালটি বছরে ৮ লাখ টিইইউস কনটেইনার পরিচালনা করতে পারবে, যার ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান কনটেইনার পরিচালনা সক্ষমতা প্রায় ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজজট, সীমিত অবকাঠামো এবং ধীরগতির পণ্য খালাস দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন টার্মিনাল চালু হলে এসব সমস্যার অনেকটাই কমবে। এতে জাহাজের অপেক্ষার সময় হ্রাস পাবে, পণ্য পরিবহন দ্রুত হবে এবং ব্যবসায়ীদের লজিস্টিকস ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের গভীরতা পর্যাপ্ত না হওয়ায় বড় আকারের কনটেইনারবাহী জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারে না। ফলে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি কিংবা আমদানির অধিকাংশ পণ্য প্রথমে ছোট আকারের ফিডার জাহাজে করে শ্রীলঙ্কার কলম্বো, সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়ার পোর্ট ক্লাংয়ের মতো আঞ্চলিক বন্দরে নেওয়া হয়। এরপর সেখান থেকে বড় জাহাজে মূল গন্তব্যে পাঠানো হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রতিটি চালানের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৭ থেকে ১৪ দিন সময় লেগে যায়।
শুধু সময় নয়, একাধিকবার কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কারণে পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যায়। একই সঙ্গে সময়মতো পণ্য সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
নতুন লালদিয়া টার্মিনাল চালু হলে প্রায় ৬ হাজার টিইইউস ধারণক্ষমতার বড় কনটেইনারবাহী জাহাজ সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তে পারবে। এর ফলে এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন প্রধান সমুদ্রপথে সরাসরি পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হবে। এতে ট্রান্সশিপমেন্টের প্রয়োজন কমবে, পরিবহন সময় হ্রাস পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ব্যয়ও কমে আসবে।
বিশেষ করে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প এই সুবিধা থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে। কারণ দ্রুত পণ্য সরবরাহ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে। পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া, পাদুকা এবং অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পও দ্রুত ও কম খরচে বিদেশে পণ্য পাঠানোর সুযোগ পাবে।
এপিএম টার্মিনালস লালদিয়ার প্রধান নির্বাহী রমেশ ডেভিড জানিয়েছেন, বর্তমানে টার্মিনালের নকশা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। প্রয়োজনীয় সরকারি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পাওয়া গেলে ২০২৬ সালের শেষের দিকে নির্মাণকাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বন্দর পরিচালনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে এপিএম টার্মিনালসের। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বিশ্বের ৬০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক বন্দর ও কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রপ্তানি খাতে সময় ও ব্যয় কমবে, সরবরাহ শৃঙ্খল আরও শক্তিশালী হবে এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

