দেশের অর্থনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। তবে এবার সেই সতর্কবার্তা এসেছে সরকারের নিজস্ব বিশ্লেষণেও। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত **‘মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি’**তে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতিকে ঘিরে একাধিক বড় ঝুঁকির কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল রাজস্ব আদায়, কমে যাওয়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক খাতের চাপ, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বিপুল দায়, দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে অর্থনীতির সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে তা ৯ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আরও কমবে, উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এর ফলে অর্থনীতি এমন এক অবস্থায় যেতে পারে, যেখানে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকবে, কিন্তু প্রবৃদ্ধি কমে যাবে। অর্থনীতির ভাষায় এটিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হলে সরকারের রাজস্ব সংগ্রহও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি কমে গেলে মূল্য সংযোজন কর, আয়কর এবং আমদানি শুল্ক থেকে প্রত্যাশিত রাজস্ব আসবে না। অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ভর্তুকি এবং অন্যান্য সরকারি ব্যয় কমানোও সহজ হবে না। ফলে একদিকে আয় কমবে, অন্যদিকে ব্যয়ের চাপ বাড়বে, যা বাজেট ব্যবস্থাপনাকে আরও কঠিন করে তুলবে।
বৈদেশিক খাত নিয়েও সতর্ক করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে চাপ তৈরি হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যেতে পারে। এতে আমদানি ব্যয় পরিশোধ, বিদেশি ঋণের কিস্তি দেওয়া এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। এর প্রভাব শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
সরকারি নথিতে আরেকটি বড় উদ্বেগ হিসেবে উঠে এসেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ১২২টি প্রতিষ্ঠানের মোট দায় দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৩৩ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেদের আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটাতে পারছে না। ফলে মূলধন সহায়তা, ঋণ পরিশোধ কিংবা বিশেষ আর্থিক প্যাকেজের মাধ্যমে সরকারকে বারবার এগিয়ে আসতে হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে সরকারি অর্থনীতির ওপর আরও বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
প্রতিবেদনে সরকারি গ্যারান্টির বিষয়টিকেও ঝুঁকির তালিকায় রাখা হয়েছে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ঋণের বিপরীতে সরকার যে গ্যারান্টি দেয়, তা তাৎক্ষণিক ব্যয় না হলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে পুরো দায় সরকারের ওপর বর্তায়। তাই নতুন গ্যারান্টি দেওয়ার আগে প্রকল্পের আর্থিক সক্ষমতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি ভালোভাবে মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংক খাতের অবস্থাও উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট, মূলধনের ঘাটতি এবং সম্পদের মানের অবনতিকে ভবিষ্যতের বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বড় কোনো ব্যাংক সংকটে পড়লে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সরকারকে অর্থ সহায়তা দিতে হতে পারে, যা সরকারি ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে।
সরকারের বিরুদ্ধে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আদালতে চলমান মামলাগুলোকেও সম্ভাব্য আর্থিক ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব মামলার রায় সরকারের বিপক্ষে গেলে ক্ষতিপূরণ কিংবা অতিরিক্ত আর্থিক দায় সৃষ্টি হতে পারে। তাই সম্ভাব্য দায়ের আগাম মূল্যায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগকেও বড় অনিশ্চয়তা হিসেবে দেখছে অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রতিবছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে কৃষি, সড়ক, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়। এসব ক্ষতি মোকাবিলা, পুনর্বাসন এবং অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা অনেক সময় বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলের যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে জ্বালানি, খাদ্যশস্য, সার এবং শিল্পের কাঁচামালের আন্তর্জাতিক দাম বাড়ার আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো এখন আর অজানা নয়। চ্যালেঞ্জগুলো সরকার নিজেও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা না গেলে আগামী দিনগুলোতে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

