বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো গত কয়েক বছর ধরে স্বর্ণবাজারের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তিগুলোর একটি ছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বর্ণের অংশ বাড়ানোর প্রবণতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের চাহিদা এবং দাম—দুই-ই ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। তবে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সেই প্রবণতায় স্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। নতুন পরিসংখ্যান বলছে, এ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার পরিমাণ ২০২২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রায় ৩৪৫ টন স্বর্ণ কিনেছে। গত চার বছরের মধ্যে বছরের প্রথমার্ধে এটি সবচেয়ে কম কেনাকাটার রেকর্ড। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজারে নতুন একটি ধারা তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে প্রথম প্রান্তিকের চিত্র আরও বিস্ময়কর। শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো প্রায় ২৪৪ টন স্বর্ণ কিনেছে। পরে সংশোধিত হিসাবে দেখা যায়, প্রকৃত কেনাকাটা ছিল মাত্র ৫৭ টনের কাছাকাছি। গত ১৫ বছরের মধ্যে কোনো প্রথম প্রান্তিকে এত কম স্বর্ণ কেনার নজির নেই।
গত চার বছরে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বর্ণের অংশ বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করেছে। একই সময়ে বৈশ্বিক রাজনৈতিক উত্তেজনা, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকির কারণে স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এসব কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল।
তবে চলতি বছরের শুরুতে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর পর আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কেনাকাটা কমে যাওয়ার তথ্য ভবিষ্যতে দামের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে ধারণা করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর প্রকৃত স্বর্ণ কেনার হিসাব নির্ধারণ করা সহজ নয়। কারণ সব দেশ নিয়মিতভাবে তাদের স্বর্ণ ক্রয়ের তথ্য প্রকাশ করে না। কিছু দেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে স্বেচ্ছায় তথ্য দিলেও এটি বাধ্যতামূলক নয়। ফলে প্রকাশ্য তথ্যের পাশাপাশি বাজারভিত্তিক বিভিন্ন উৎসের তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব হিসাব প্রস্তুত করা হয়।
ডব্লিউজিসির বাজার কৌশলবিদ জন রিডের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার তথ্য আরও গোপনীয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ২০২২ সালে রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা জারির পর অনেক উন্নয়নশীল দেশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনার উদ্যোগ নেয়। তখন থেকেই স্বর্ণ কেনাবেচার তথ্য প্রকাশের ধরনেও পরিবর্তন আসে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথমার্ধে শুধু কেনাকাটা কমেনি, কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান স্বর্ণ বিক্রিও করেছে। তুরস্ক, রাশিয়া এবং আজারবাইজানের কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠান এ সময়ে কেনার তুলনায় বেশি স্বর্ণ বিক্রি করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর চাহিদা কমলেও বৈশ্বিক স্বর্ণবাজার পুরোপুরি দুর্বল হয়ে পড়েনি। বছরের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বব্যাপী মোট স্বর্ণের চাহিদা ছিল প্রায় ২ হাজার ৫২২ টন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ সরকারি কেনাকাটা কমলেও ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের চাহিদা বাজারকে এখনো সহায়তা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে দীর্ঘদিন ধরেই স্বর্ণবাজারে দামের একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ তাদের বড় পরিসরের কেনাকাটা বাজারে স্থায়ী চাহিদা তৈরি করে। তবে স্বর্ণের ভবিষ্যৎ মূল্য শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রয় কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে না। বিনিয়োগকারীদের আচরণ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিভিন্ন দেশের নীতিগত সিদ্ধান্তও বাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

