বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের কার্যক্রম এখনো প্রত্যাশিত গতিতে ফিরছে না। ব্যবসা ও শিল্প খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে ব্যাংক থেকে বেসরকারি খাতে অর্থ প্রবাহও প্রায় স্থবির অবস্থায় রয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার পরও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন ঋণ নেওয়ার আগ্রহ বাড়ছে না।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশে। এর আগে জুন মাসে এই প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছিল ঐতিহাসিক সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে।
এর আগে টানা পাঁচ মাস ধরে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে ছিল। মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে যথাক্রমে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ, ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০০ বিলিয়ন টাকার প্রণোদনা প্যাকেজসহ বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা ঘোষণা করেছিল। লক্ষ্য ছিল বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প কার্যক্রম পুনরায় সচল করা, উৎপাদন বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। কিন্তু বাস্তবে এসব উদ্যোগের পরও বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি।
বাংলাদেশ ব্যাংক জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের মুদ্রানীতিতে ডিসেম্বরের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল।
এই লক্ষ্য অর্জনের অংশ হিসেবে ৩০ জুলাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিগত সুদের হার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করে।
তবে ঋণ প্রবৃদ্ধির বর্তমান চিত্র দেখাচ্ছে, শুধু সুদের হার কমানোই ব্যবসায়ীদের নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে পারছে না। একদিকে উদ্যোক্তাদের ঋণের চাহিদা কমেছে, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সমস্যায় থাকা ঋণগ্রহীতাদের সহায়তার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন সুবিধা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা দিয়ে দুই বছরের স্থগিত সুবিধার মাধ্যমে ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ।তবে এসব সুবিধার পরও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি এখনো কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বেসরকারি ঋণের দুর্বল প্রবৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে।
ব্যাংকগুলো বর্তমানে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী হয়ে উঠেছে। একই সময়ে ব্যবসায়ীরাও নতুন প্রকল্প শুরু বা সম্প্রসারণের বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিনিময় হারজনিত চাপ এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি—সব মিলিয়ে ব্যবসার পরিবেশ কঠিন হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, শিল্পাঞ্চলে অনেক কারখানা জ্বালানি সংকটের কারণে স্বাভাবিক উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগ বা ব্যবসা সম্প্রসারণের চিন্তা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই শেষে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ কমেছে।
মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি সাধারণত ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। এই খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ইঙ্গিত দেয় যে ব্যবসায়ীরা নতুন কারখানা স্থাপন বা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাচ্ছেন।
ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম শামসুল আরেফিন বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা ও দেশের শিল্প খাতে জ্বালানি সংকট উদ্যোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
তার মতে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব দেশের অর্থনীতিতেও পড়ছে এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল আলম খান বলেন, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, মানুষের আয় কমে যাওয়া এবং রপ্তানি চাহিদার দুর্বলতা বাজারের স্বাভাবিক গতি কমিয়ে দিয়েছে।
তিনি জানান, দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এর ফলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং বাণিজ্যিক লেনদেনের জন্য ঋণপত্র খোলার কার্যক্রমও অনেক ক্ষেত্রে কমে গেছে।
তার মতে, ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে তারা নতুন ঋণ বিতরণে সতর্ক হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে মোট ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ৩২ শতাংশের বেশি হওয়ায় ব্যাংকগুলো ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিবর্তে তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে অর্থ বিনিয়োগ করছে।এর ফলে বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি বেসরকারি বিনিয়োগে পড়ে।
ব্যাংকগুলো যখন নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি সতর্ক হয়, তখন ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন। কারণ তাদের ব্যবসা পরিচালনা ও সম্প্রসারণের জন্য ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বেশি।
একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাজারে পণ্যের চাহিদাও দুর্বল হয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে।
করোনাভাইরাস মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা, নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা—সবকিছু মিলিয়ে দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ চাপের মধ্যে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের চাহিদা কমিয়েছে এবং শিল্প উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট শিল্প খাতের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার মতে, গত দুই অর্থবছর—২০২৫ ও ২০২৬—সরকারি উন্নয়ন ব্যয় ও সরকারি বিনিয়োগ সাম্প্রতিক বছরের তুলনায় কম ছিল। অথচ এসব উন্নয়ন কার্যক্রমের বড় অংশ বাস্তবায়ন করে বেসরকারি উদ্যোক্তারা।
বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, শুধু আর্থিক প্রণোদনা বা সুদের হার কমানো দিয়ে বেসরকারি খাতে গতি ফিরিয়ে আনা কঠিন।
ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কমানো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
কারণ অর্থনীতির বড় অংশ নির্ভর করে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও উৎপাদনের ওপর। ঋণের প্রবাহ যদি দুর্বল থাকে, তাহলে শিল্প সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বর্তমান ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের ব্যবসায়িক আস্থা, বিনিয়োগ পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত দিচ্ছে।

