জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আবারও বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়েছে সরকার। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের হিসাব বলছে, রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়, বাজেট বাস্তবায়ন এবং সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা। অথচ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্য অর্জনে প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ রাজস্ব ঘাটতি থেকে গেছে। যদিও আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ১২ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, তবুও সেই প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য যথেষ্ট ছিল না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি কেবল একটি অর্থবছরের সমস্যা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। করের হার বৃদ্ধির চেয়ে করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি কমানো এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব না দিলে প্রতি বছরই একই ধরনের ঘাটতি দেখা দেবে। তাদের মতে, বাস্তব অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় না এনে অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্য নির্ধারণ করলে বছর শেষে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
রাজস্ব আদায়ের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে কোনো অর্থবছরেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি। সাম্প্রতিক পাঁচ অর্থবছরের তথ্যও একই চিত্র তুলে ধরে। ২০২১-২২ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৩৫ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। পরবর্তী ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঘাটতি আরও বেড়ে হয় ৪৮ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ঘাটতি পৌঁছে যায় ৯২ হাজার ৬২৫ কোটি টাকায়। সর্বশেষ বিদায়ী অর্থবছরে ঘাটতি কিছুটা কমে ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকায় নেমে এলেও এটি এখনো অত্যন্ত বড় অঙ্ক।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ে সরকারের অর্থ ব্যবস্থাপনায়। রাজস্ব প্রত্যাশার তুলনায় কম হলে সরকারকে উন্নয়ন ব্যয় চালিয়ে যেতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। এতে ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ বাড়ে এবং ভবিষ্যতে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতাও সীমিত হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং অবকাঠামো খাতের ব্যয় ব্যবস্থাপনাতেও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
রাজস্বের সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে ভ্যাট খাত এবারও শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরে ভ্যাট থেকে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। আয়কর খাত থেকে এসেছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬২০ কোটি টাকা এবং কাস্টমস শুল্ক থেকে আদায় হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ১১৯ কোটি টাকা। তিনটি খাতেই আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও কোনোটিই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করতে পারেনি। এটি ইঙ্গিত দেয় যে রাজস্ব ব্যবস্থার মৌলিক সমস্যাগুলো এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
তবে অর্থবছরের শেষ মাস জুনে রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য গতি ফিরে আসে। ওই মাসে মোট ৫৪ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে কাস্টমস খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৭১ দশমিক ৮৩ শতাংশ, ভ্যাট খাতে ২২ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং আয়কর খাতে ১৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ। যদিও শেষ মুহূর্তের এই অগ্রগতি সামগ্রিক ঘাটতি পূরণ করতে পারেনি, তবুও এটি রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে শুধু করের হার বাড়ানো যথেষ্ট নয়। বরং নতুন করদাতাদের করজালের আওতায় আনা, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান আরও কার্যকর করা, প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসন গড়ে তোলা এবং কর ফাঁকি রোধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ডিজিটাল তথ্যভান্ডার ও স্বয়ংক্রিয় কর ব্যবস্থাপনা চালু হলে রাজস্ব আদায়ে আরও স্বচ্ছতা ও গতি আসতে পারে বলে তারা মনে করেন।
এদিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বিদায়ী অর্থবছরের তুলনায় ৪৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, কর প্রশাসনে কার্যকর সংস্কার, করজাল সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের প্রসার এবং করদাতাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না গেলে এত বড় প্রবৃদ্ধি অর্জন অত্যন্ত কঠিন হবে।
সব মিলিয়ে বিদায়ী অর্থবছরের রাজস্ব চিত্র একদিকে যেমন আদায়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে বড় ঘাটতি আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের বিকল্প নেই। লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি সেই লক্ষ্য অর্জনের বাস্তব সক্ষমতা তৈরি করাই এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

