দেশের বাজারে যখন মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমার আভাস দেখা যাচ্ছিল, ঠিক তখনই সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম একসঙ্গে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। সরকারের আকস্মিক ঘোষণায় ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম বাড়ানো হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং কৃষি, শিল্প, পণ্য পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচেও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, জ্বালানির দাম বাড়লে এর প্রভাব খুব দ্রুত সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছে যায়। পরিবহন ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পণ্য পরিবহনের খরচ বৃদ্ধি পায়, যার প্রভাব পড়ে খাদ্যসহ প্রায় সব ধরনের পণ্যের দামে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অতীতে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পরের মাসগুলোতেই মূল্যস্ফীতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে জ্বালানির দাম বাড়ানোর পর মূল্যস্ফীতি মার্চের ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ থেকে বেড়ে এপ্রিল মাসে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ এবং মে মাসে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছায়।
এর আগে ১৯ এপ্রিল চলতি বছরে সরকার ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ১৫ টাকা, অকটেনের দাম ২০ টাকা, পেট্রোলের দাম ১৯ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বাড়িয়েছিল। যদিও জুন ২০২৬ সালের মূল্য সমন্বয়ে প্রতি লিটারে মাত্র ৫ টাকা বাড়ানোর কারণে ভোক্তা মূল্য সূচকে তাৎক্ষণিক বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি, তবে এবার তুলনামূলক বেশি হারে দাম বাড়ায় অর্থনীতিবিদরা বড় ধরনের প্রভাবের আশঙ্কা করছেন।
গত কয়েক বছরেও জ্বালানি তেলের দামের পরিবর্তন মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকার চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ১ টাকা এবং একই বছরের ডিসেম্বর মাসে ২ টাকা করে বাড়িয়েছিল। তবে সেই সময় দাম বৃদ্ধির পরিমাণ কম থাকায় মূল্যস্ফীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়নি।
তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছিল ২০২২ সালের জুলাই মাসে। ওই সময় জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর মাত্র এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ০৪ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে যায়। জুলাই মাসে যেখানে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ, আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে।
সোমবার থেকে কার্যকর হওয়া নতুন দামের ফলে ডিজেলের দাম ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা হয়েছে। অকটেনের দাম হয়েছে ১৬৫ টাকা, পেট্রোলের দাম ১৬০ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের ভর্তুকিজনিত ক্ষতি কমাতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মার্চ থেকে প্রতিষ্ঠানটির ভর্তুকি ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২৮ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন টাকা। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে স্বল্পমেয়াদে সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব ধীরে ধীরে ছড়ায় না, বরং খুব দ্রুত বাজারে দেখা যায়। প্রথম ধাক্কাটি আসে পরিবহন খাতে। এরপর সেই ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব পড়ে কৃষি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায়।
ঘোষণার পরপরই ঢাকার বিভিন্ন রুটে বাস ভাড়া ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। দেশের বাণিজ্যিক পরিবহন ব্যবস্থার বড় অংশ ডিজেলনির্ভর হওয়ায় যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের খরচ দ্রুত বাড়ছে।
এর ফলে বাজারে সবজি, চাল, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ পণ্য উৎপাদনের পর তা কৃষকের ক্ষেত থেকে শহরের বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে পরিবহন খরচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কৃষি খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ কৃষি সেচ পাম্প ডিজেলচালিত। ফলে ডিজেলের দাম ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ায় সেচ, ফসল কাটা এবং মাড়াইয়ের খরচ বেড়ে যাবে। এর সঙ্গে গ্রাম থেকে শহরে কৃষিপণ্য পরিবহনের খরচ যোগ হলে সাধারণ ভোক্তাদের জন্য খাদ্যের দাম আরও বাড়তে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রভাব। প্রথমে পরিবহন খরচ বাড়ে, পরে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায় এবং শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয় ভোক্তার ওপর চাপানো হয়।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে মূল্যস্ফীতি সরাসরি বাড়বে। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে গত কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসছিল। এমন পরিস্থিতিতে বড় ধরনের জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি আবারও ভোক্তা মূল্য সূচকে চাপ তৈরি করবে।
তার মতে, বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন ছিল। কারণ ডিজেল সরাসরি পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতের সঙ্গে যুক্ত। এসব খাতে খরচ বাড়লে এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত প্রভাব আগামী কয়েক মাসে আরও স্পষ্ট হবে। বাজার পরিস্থিতি, পরিবহন ব্যয় এবং উৎপাদন খরচের পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতির পরবর্তী গতিপথ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে একদিকে ভর্তুকির চাপ কমানো, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা। কারণ জ্বালানি শুধু একটি পণ্য নয়, বরং দেশের প্রায় সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

