যুক্তরাষ্ট্রের পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমে গেছে। একই সময়ে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি বেড়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এশিয়ার প্রধান পোশাক সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার চিত্রও বদলে যাচ্ছে। বিশেষ করে চীনের রপ্তানিতে বড় পতনের বিপরীতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের প্রবৃদ্ধি মার্কিন ক্রেতাদের সরবরাহের উৎসে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বস্ত্র ও পোশাক কার্যালয়ের ৪ আগস্ট প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটিতে বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৪.০১ বিলিয়ন ডলারের। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪.২৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৫.৫৮ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমার পেছনে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে দায়ী করছেন রপ্তানিকারকেরা। এসব কারণে মার্কিন ভোক্তাদের পোশাক কেনার আগ্রহ কমেছে। প্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয়কে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে অনেক ভোক্তা পোশাক কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশীয় বাজারের বিভিন্ন সমস্যাও বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় চাপ তৈরি করছে। বিদ্যুতের উচ্চ ব্যয়, গ্যাস ও বিদ্যুতের অপর্যাপ্ত সরবরাহ, ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি এবং শ্রম ব্যয় বাড়ার কারণে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র মোট ৩৫.০৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই আমদানির পরিমাণ ছিল ৩৮.০২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি কমেছে ৭.৭১ শতাংশ। বাজারের সামগ্রিক চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যেও নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়েছে।
এই সময়ে চীনকে পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পোশাক সরবরাহকারী দেশ হয়েছে ভিয়েতনাম। বছরের প্রথম ছয় মাসে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রে ৭.৮৫ বিলিয়ন ডলারের পোশাক পাঠিয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১.৩৩ শতাংশ বেশি।
প্রধান পোশাক সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি করেছে কম্বোডিয়া। দেশটি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ২.১৩ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় তাদের রপ্তানি বেড়েছে ১২.৬১ শতাংশ।
ইন্দোনেশিয়াও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভালো করেছে। দেশটির পোশাক রপ্তানি ৩.৬৭ শতাংশ বেড়ে ২.৩৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানির দিক থেকে ইন্দোনেশিয়া ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে।
অন্যদিকে ভারতের পোশাক রপ্তানিতে বড় পতন হয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রে ২.৮৩ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২.১২ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ ভারতের রপ্তানি কমেছে ২৫.১৯ শতাংশ।
চীনের অবস্থাও আরও দুর্বল হয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পোশাক রপ্তানি ছিল ৫.৭২ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের একই সময়ে তা ৩৭.৬৫ শতাংশ কমে ৩.৫৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। চীনের এই বড় পতনের বিপরীতে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার প্রবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক সরবরাহের বাজারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অবস্থান শক্ত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান মনে করেন, সরবরাহের সময় এবং মূল্য সংযোজিত পণ্যের ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। তার মতে, এসব দেশ কাঁচামালের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর হলেও ভৌগোলিকভাবে চীনের কাছাকাছি হওয়ায় খুব কম সময়ে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারে। এতে উৎপাদন থেকে পণ্য সরবরাহ পর্যন্ত সময় কম রাখা সম্ভব হয়।
ভিয়েতনামের আরেকটি বড় সুবিধা হলো সেখানে চীনা বিনিয়োগ রয়েছে। বাংলাদেশ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এ ধরনের বিনিয়োগ আকর্ষণে পিছিয়ে পড়েছে বলে মনে করেন পোশাক খাতের এই নেতা।
ইন্দোনেশিয়ার অগ্রগতির পেছনে কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক উৎপাদনের সক্ষমতাকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি। বিশ্ববাজারে কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি পোশাকের চাহিদা বাড়ায় এই খাতে ইন্দোনেশিয়া বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের পোশাকশিল্প সংগঠন জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী সরবরাহব্যবস্থায় একের পর এক সংকট তৈরি হওয়ায় মার্কিন ক্রেতারা সরবরাহকারীর সংখ্যা কমিয়ে নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের ওপর বেশি নির্ভর করার দিকে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়তে থাকা সুরক্ষামূলক শুল্ক, বিভিন্ন বিধিবিধান মেনে চলার চাপ এবং প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে পণ্য পরিবহনের ব্যয়ের ওঠানামাও ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে বাংলাদেশের সামনে এখন প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। চীনের জায়গা দখল করে ভিয়েতনামের শীর্ষে উঠে আসা এবং কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেখাচ্ছে, কম খরচে দ্রুত সরবরাহ এবং বৈচিত্র্যময় পোশাক উৎপাদনের সক্ষমতা ভবিষ্যতে মার্কিন ক্রেতাদের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের জন্য তাই উৎপাদন ব্যয় কমানো, জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা এবং মূল্য সংযোজিত পোশাকের উৎপাদন বাড়ানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

