সুন্দরবনের কাছাকাছি রামপাল এলাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে সরকার। দ্বিতীয় একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের যে পরিকল্পনা ছিল, পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে সেটি আর বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। সেই জায়গাতেই এবার নির্মাণ করা হবে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র।
বৃহস্পতিবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের মতো পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকার কাছে আরও একটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে বেছে নেওয়াকে বেশি উপযোগী মনে করা হয়েছে।
এ সিদ্ধান্ত শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিবর্তন নয়, বরং দেশের জ্বালানি পরিকল্পনায় পরিবেশগত বিষয়গুলোকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়ার একটি ইঙ্গিতও দিচ্ছে। বিশেষ করে সুন্দরবনের নিকটবর্তী এলাকায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের প্রেক্ষাপটে রামপালের এই পরিবর্তন তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ইতোমধ্যে ২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা ব্যয়ের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে জমা দিয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ২ হাজার ১২৭ কোটি টাকা বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিল থেকে এবং বাকি ৩৭৫ কোটি টাকা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এর কাজ শেষ করার সময়সীমা ধরা হয়েছে ডিসেম্বর ২০২৯। তবে তার আগে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন হবে। বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটির বিভিন্ন দিক যাচাই-বাছাই করছে।
নির্ধারিত জমিতেই নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র
রামপালের বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে যে জমিতে দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেই জমিই এখন সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ব্যবহার করা হবে। বাগেরহাট জেলার রামপাল এলাকায় অবস্থিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য মোট ৯১৮ দশমিক ৫ একর জমি আগে থেকেই উন্নয়ন করা হয়েছে।
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎ কোম্পানি পরিচালনা করছে। বর্তমান স্থাপনার একটি অংশে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রয়েছে। এর পাশের ব্লকটি ভবিষ্যতে একই ক্ষমতার আরও একটি কয়লাভিত্তিক ইউনিট নির্মাণের জন্য নির্ধারিত ছিল।
সেই পরিকল্পনাই এখন পরিবর্তন করা হয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য আগে থেকে প্রস্তুত করা জমি খালি রেখে না দিয়ে সেখানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের যুক্তি, জমিটি আগে থেকেই উন্নত এবং সীমানা সুরক্ষিত থাকায় নতুন করে অবকাঠামো তৈরির প্রয়োজন তুলনামূলক কম হবে। ফলে সম্পূর্ণ নতুন জায়গায় একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের তুলনায় এখানে নির্মাণ ব্যয়ও কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অবকাঠামো প্রস্তুত থাকার বিষয়টি প্রকল্পটির অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বড় আকারের বিদ্যুৎ প্রকল্পে জমি উন্নয়ন, সীমানা নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় প্রাথমিক অবকাঠামো তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হয়। রামপালের ক্ষেত্রে এসব কাজের একটি বড় অংশ আগেই সম্পন্ন থাকায় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দামেও সুবিধা
প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছে ৬ টাকা ১৮ পয়সা। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এই দাম অন্য কিছু প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
উদাহরণ হিসেবে ফেনীর সোনাগাজীতে প্রস্তাবিত ২২০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুতের সম্ভাব্য দাম ধরা হয়েছে প্রতি ইউনিট ৮ টাকা ৮৭ পয়সা। সেই হিসাবে রামপালের প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ প্রায় ৪৩ শতাংশ কম দামে উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করছে।
বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় কম রাখা গেলে এর প্রভাব শুধু সরকারের ব্যয়ের ওপর নয়, দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক ব্যয় কাঠামোর ওপরও পড়তে পারে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর জ্বালানির মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে ওঠানামা করলে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্ব আরও বাড়ে।
সুন্দরবনের কাছাকাছি কয়লা প্রকল্প নিয়ে পুরোনো উদ্বেগ
রামপালে দ্বিতীয় কয়লাভিত্তিক ইউনিট না করার সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি হলো পরিবেশ। সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল এবং এর আশপাশে বড় ধরনের শিল্প ও জ্বালানি প্রকল্প নিয়ে পরিবেশবিদদের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে বায়ুদূষণ, ছাই ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়গুলো জড়িত। সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল পরিবেশব্যবস্থার পাশে এমন প্রকল্প বাড়ানো হলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এ কারণেই দ্বিতীয় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক ইউনিটের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে দেখা হচ্ছে। তবে স্থানীয় পরিবেশবাদীদের মতে, শুধু কয়লার পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। প্রকল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নির্মাণকাজ এবং পুরো পরিচালন প্রক্রিয়ায় পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
বিশেষ করে সুন্দরবনের কাছাকাছি হওয়ায় প্রকল্পটির প্রতিটি ধাপে পরিবেশগত সতর্কতা বজায় রাখার প্রয়োজন রয়েছে। বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে উৎপাদনের পরিমাণের পাশাপাশি আশপাশের নদী, মাটি, জীববৈচিত্র্য ও বনাঞ্চলের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।
দেশের সবচেয়ে বড় সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনার সম্ভাবনা
প্রস্তাবিত ৪৪২ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হবে। প্রকল্পটি দেশের সবচেয়ে বড় একক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনা হিসেবে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
এর মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চাহিদা বাড়লেও নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির ক্ষেত্রে শুধু কয়লা, গ্যাস বা অন্যান্য প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভর না করে নবায়নযোগ্য উৎসের দিকে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
বিশ্বজুড়েই জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এখন একই আলোচনার অংশ। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো একদিকে জ্বালানি বৈচিত্র্য তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত চাপ কমানোর সুযোগও তৈরি করতে পারে।
২০৩০ সালের লক্ষ্যের সঙ্গে মিল
রামপালের নতুন পরিকল্পনাটি বাংলাদেশের জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই কৌশলের আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই লক্ষ্য অর্জন সহজ নয়। কারণ দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে এবং একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার চাপও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাড়ানো প্রয়োজন হলেও উৎপাদনের স্থায়িত্ব, সংরক্ষণ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো এবং প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতার বিষয়গুলোও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
রামপালের ক্ষেত্রে একটি সুবিধা হলো, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য নির্ধারিত জমি আগে থেকেই উন্নত করা আছে। ফলে নতুন জায়গা দখল বা বড় পরিসরে ভূমি উন্নয়নের প্রয়োজন কম। একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছাকাছি অবকাঠামো ব্যবহার করার সুযোগ থাকলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় সঞ্চালন ব্যবস্থায় যুক্ত করাও তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
কয়লা থেকে সৌরে পরিবর্তনের বড় তাৎপর্য
রামপালে দ্বিতীয় কয়লাভিত্তিক ইউনিটের বদলে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্তকে শুধু একটি প্রকল্পের প্রযুক্তি পরিবর্তন হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি ধরা পড়বে না। এর মধ্যে দেশের জ্বালানি নীতির একটি পরিবর্তিত অগ্রাধিকারও স্পষ্ট হচ্ছে।
একসময় বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে বড় আকারের কয়লাভিত্তিক প্রকল্পকে গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু পরিবেশগত ক্ষতি, জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু প্রতিশ্রুতির বিষয়গুলো সামনে আসায় সেই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়েছে।
রামপালে দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য নির্ধারিত জমিকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা তাই প্রতীকীভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। একই জায়গায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে, কিন্তু জ্বালানির ধরন বদলে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তার সঙ্গে পরিবেশগত দায়বদ্ধতার সমন্বয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে প্রকল্পটি সফল করতে হলে শুধু স্থাপনা নির্মাণ করাই যথেষ্ট হবে না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা, বিদ্যুতের ঘোষিত উৎপাদনমূল্য বজায় রাখা এবং সুন্দরবনের পরিবেশ সুরক্ষায় কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে, রামপালের এই পরিবর্তন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও হতে পারে। কয়লাভিত্তিক দ্বিতীয় ইউনিটের পরিবর্তে ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়িত হলে একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির একটি বাস্তব উদাহরণ তৈরি হবে। আর সেটি সফল হলে দেশের অন্যান্য বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তনের পথ আরও বিস্তৃত হতে পারে।

