বাংলাদেশের পর্যটন খাতে সম্ভাবনার অভাব নেই। সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, বন, নদী, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, গ্রামীণ জীবন ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে দেশটির পর্যটন শিল্পকে বড় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত করার সুযোগ রয়েছে। দেশীয় পর্যটনের চাহিদাও বাড়ছে, পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের জন্যও বাংলাদেশের নতুন নতুন আকর্ষণ সামনে আসছে।
তবে সম্ভাবনা আর বাস্তব বিনিয়োগের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়ে গেছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, উচ্চ কর, তুলনামূলক কম মুনাফা, নীতিগত দুর্বলতা, সীমিত বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বয়ের ঘাটতি পর্যটন খাতের বিকাশকে আটকে রাখছে।
৮ আগস্ট ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ভ্রমণ, পর্যটন ও বিমান চলাচল খাতের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’ বা টিটিডিসির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব বিষয় উঠে আসে।
সম্ভাবনা থাকলেও বিনিয়োগ কেন কম
পর্যটন খাতে বিনিয়োগের অন্যতম বড় সমস্যা হলো বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত আয় নিশ্চিত না হওয়া। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, উচ্চ করের চাপের সঙ্গে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও নীতিগত জটিলতা যুক্ত হওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
শুধু নতুন হোটেল বা পর্যটনকেন্দ্র তৈরি করলেই পর্যটন শিল্পের বিকাশ সম্ভব নয়। একটি পর্যটন গন্তব্যে যেতে সহজ যোগাযোগব্যবস্থা, উন্নত বিমানবন্দর, নির্ভরযোগ্য পরিবহন, মানসম্মত আবাসন, নিরাপত্তা, বিনোদন এবং পর্যটকবান্ধব সেবা—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।
এই পুরো ব্যবস্থার কোনো একটি অংশ দুর্বল থাকলেও পর্যটকের অভিজ্ঞতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও তার সুফল বিনিয়োগকারীর কাছে প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায় না।
দেশের গল্প আছে, কিন্তু প্রচার দুর্বল
টিটিডিসির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও শেয়ারট্রিপের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদিয়া হক বলেন, বাংলাদেশের পর্যটনের নিজস্ব একটি শক্তিশালী গল্প রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেই গল্প যথাযথভাবে তুলে ধরা হচ্ছে না।
তার মতে, পর্যটন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে প্রথমে বিনিয়োগের বাধাগুলো দূর করতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশি পর্যটকদের বাংলাদেশ সম্পর্কে যে ধারণা তৈরি হচ্ছে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
ভ্রমণসংক্রান্ত নেতিবাচক সতর্কবার্তাও বিদেশি পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ নিয়ে তাদের ভ্রমণ সতর্কতা তৃতীয় স্তর থেকে দ্বিতীয় স্তরে নামিয়েছে। একই সময়ে জাপানও বাংলাদেশের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা দ্বিতীয় স্তর থেকে প্রথম স্তরে নামিয়েছে।
এই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নের একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে সেটিকে কাজে লাগাতে হলে পর্যটন অবকাঠামো ও সেবার মানও একই সঙ্গে উন্নত করতে হবে।
পর্যটনের অবদান এখন প্রায় ৩ শতাংশ
বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে পর্যটন খাত বর্তমানে প্রায় ৩ শতাংশ অবদান রাখছে। সরকার এই অবদান বাড়িয়ে ৬ থেকে ৭ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানাম বলেন, এই লক্ষ্য অর্জনে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সংশ্লিষ্ট সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মানে পর্যটন, ভ্রমণ, বিমান চলাচল ও আতিথেয়তা খাতকে উন্নীত করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। পাশাপাশি টিটিডিসি সরকারি ও বেসরকারি অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয়ের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মন্ত্রী আরও বলেন, গত ১৭ বছরে পর্যটন খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন খুব বেশি হয়নি। তবে বর্তমান সরকার দেশের অব্যবহৃত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে উদ্যোগ নিচ্ছে।
২০ লাখের বেশি কর্মসংস্থান
পর্যটন খাতের গুরুত্ব শুধু অর্থনীতিতে অবদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। টিটিডিসির নির্বাহী কমিটির সদস্য শহীদ হামিদ বলেন, পর্যটন খাত বর্তমানে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে প্রায় ৩ শতাংশ অবদান রাখছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
হোটেল, বিমান সংস্থা, রেস্তোরাঁ এবং স্থানীয় পর্যটনসেবাসহ বিভিন্ন খাতে এই শিল্প ২০ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে।
দেশের ৩০টির বেশি জেলায় স্বীকৃত পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। অর্থাৎ পর্যটন শিল্পের বিস্তার শুধু রাজধানী বা কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। সঠিক পরিকল্পনা করা গেলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি করা সম্ভব।
এখানেই পর্যটন খাতের বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। একটি পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠলে শুধু হোটেল বা রেস্তোরাঁ নয়, পরিবহন, হস্তশিল্প, স্থানীয় খাবার, কৃষিপণ্য, বিনোদন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার মতো বহু খাতও এর সঙ্গে যুক্ত হয়।
‘ব্র্যান্ড বাংলাদেশ’ গড়ার ঘাটতি
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, পর্যাপ্ত সম্পদ ও সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো কার্যকরভাবে একটি শক্তিশালী জাতীয় ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারেনি।
তার মতে, বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরতে বছরে প্রায় ৮ থেকে ১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। অথচ দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার প্রায় ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং সরকারের মোট বাজেট প্রায় ৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
অর্থাৎ দেশের সামগ্রিক সরকারি ব্যয়ের তুলনায় একটি শক্তিশালী জাতীয় ব্র্যান্ড তৈরির প্রচারে প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ খুবই সামান্য। কিন্তু এই বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হতে পারে অনেক বড়।
আশিক চৌধুরী জানান, গত শনিবার প্রধানমন্ত্রী, কয়েকজন মন্ত্রী এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ‘ব্র্যান্ড বাংলাদেশ’ নিয়ে বৈঠক হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা শেষে একটি কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না
পর্যটন খাতে সরকারি অর্থ বরাদ্দ থাকলেও তার বড় অংশ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত নীতি ও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।
তিনি জানান, চলতি বছর বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা পেয়েছে। তবে এর বড় অংশ স্থানীয় বিমানবন্দর অবকাঠামোর জন্য বরাদ্দ হয়েছে। ফলে বৃহত্তর অর্থে ভ্রমণ ও পর্যটন খাতের উন্নয়নে ব্যয়ের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বিমানবন্দর তৈরি বা উন্নত করা পর্যটন উন্নয়নের প্রয়োজনীয় অংশ হলেও সেটিই পুরো পর্যটন অবকাঠামো নয়। একজন বিদেশি পর্যটক বিমানবন্দরে নামার পর কীভাবে পর্যটনকেন্দ্রে যাবেন, কোথায় থাকবেন, কী ধরনের সেবা পাবেন এবং কতটা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণ করতে পারবেন—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
টিটিডিসি কেন গুরুত্বপূর্ণ
নতুন প্রতিষ্ঠান টিটিডিসি সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয়ের একটি জায়গা তৈরি করতে চায়। এর লক্ষ্য হলো পর্যটন, আতিথেয়তা ও বিমান চলাচল খাতের টেকসই উন্নয়নে নীতিগত আলোচনা, জ্ঞান বিনিময়, শিল্পের মধ্যে সহযোগিতা এবং প্রচার কার্যক্রমকে শক্তিশালী করা।
টিটিডিসির সভাপতি কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো একটি সমন্বিত ভ্রমণব্যবস্থা তৈরি করা। যেখানে বিমানবন্দর হবে দক্ষ, বিমান সংস্থাগুলো হবে প্রতিযোগিতামূলক এবং একজন পর্যটক শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নির্বিঘ্ন সেবা পাবেন।
এ ধরনের ব্যবস্থা গড়ে উঠলে বাংলাদেশের পর্যটন শুধু কয়েকটি জনপ্রিয় গন্তব্যের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অর্থনীতিকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
বিনিয়োগ বাড়াতে কী দরকার
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে পর্যটন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, করব্যবস্থা ও বিনিয়োগের শর্ত এমন পর্যায়ে আনতে হবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বিনিয়োগকারীরা যুক্তিসংগত মুনাফার সম্ভাবনা দেখতে পান।
দ্বিতীয়ত, পর্যটনকেন্দ্রিক অবকাঠামোকে শুধু রাস্তা বা বিমানবন্দর নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আবাসন, পরিবহন, নিরাপত্তা, বিনোদন ও পর্যটকসেবার সমন্বিত কাঠামো তৈরি করতে হবে।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার জন্য পরিকল্পিত প্রচার কার্যক্রম প্রয়োজন। দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বা ঐতিহাসিক স্থাপনার তালিকা প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়; এগুলোকে একটি আকর্ষণীয় জাতীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে।
চতুর্থত, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। পর্যটন শিল্পের সঙ্গে বিমান চলাচল, সড়ক যোগাযোগ, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং বাণিজ্য—সবকিছুই জড়িত।
সবশেষে, বেসরকারি খাতকে শুধু বিনিয়োগকারী হিসেবে না দেখে পর্যটন পরিকল্পনার অংশীদার হিসেবে যুক্ত করতে হবে।
সম্ভাবনা বড়, কিন্তু সিদ্ধান্তও জরুরি
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প এমন একটি খাত, যেখানে একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা আয়, কর্মসংস্থান, স্থানীয় ব্যবসার প্রসার এবং দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু শুধু পর্যটন সম্পদ থাকলেই পর্যটন শিল্প গড়ে ওঠে না। সেই সম্পদকে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করতে প্রয়োজন বিনিয়োগ, অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, কার্যকর নীতি, আন্তর্জাতিক প্রচার এবং পর্যটকবান্ধব সেবা।
বর্তমানে বাংলাদেশের পর্যটন খাত মোট দেশজ উৎপাদনে প্রায় ৩ শতাংশ অবদান রাখছে। সরকার যেখানে তা ৬-৭ শতাংশে উন্নীত করতে চায়, সেখানে বিনিয়োগকারীদের উচ্চ কর ও কম মুনাফার কারণে পিছিয়ে থাকা একটি বড় সংকেত।
তাই সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি পর্যটনকে শুধু প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদের প্রদর্শনী হিসেবে রাখবে, নাকি এটিকে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক শিল্পে পরিণত করবে?
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় পথ বেছে নিতে হলে নীতির পরিবর্তনের পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিবেশও বদলাতে হবে। কারণ সম্ভাবনা যত বড়ই হোক, বিনিয়োগ ছাড়া সেই সম্ভাবনা বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ নেবে না।
টিটিডিসির যাত্রা সেই সমন্বয়ের একটি নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। এখন এই উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে সরকারি নীতি, বেসরকারি বিনিয়োগ ও দেশের পর্যটন সম্ভাবনাকে একই সুতায় বাঁধতে পারে, সেটিই হবে মূল পরীক্ষা।

