দেশে শিল্প ও অবকাঠামো নির্মাণের গতি কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশীয় পূর্বনির্মিত ইস্পাত কাঠামো শিল্পে। একদিকে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন কমেছে, অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগেও গতি নেই। এর সঙ্গে শুল্কমুক্ত আমদানি যুক্ত হওয়ায় স্থানীয় উৎপাদকদের সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
পূর্বনির্মিত ইস্পাত কাঠামো মূলত কারখানা, গুদাম, বাণিজ্যিক ভবন ও বিভিন্ন শিল্প স্থাপনায় ব্যবহার করা হয়। শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশের এই বাজারের আকার প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। এর প্রায় ৮০ শতাংশ চাহিদা আসে শিল্প প্রকল্প থেকে, ১৫ শতাংশ বাণিজ্যিক নির্মাণ এবং বাকি ৫ শতাংশ আবাসিক খাত থেকে। ফলে নতুন কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিংবা বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ কমে গেলে এই শিল্পের ওপর তার প্রভাব সরাসরি পড়ে। সাম্প্রতিক অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির সংশোধিত বরাদ্দের মাত্র ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে, যা ৫৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি প্রকল্পে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পূর্বনির্মিত ইস্পাত কাঠামোর চাহিদা প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে।
এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা। শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য নতুন বিনিয়োগ না হলে কারখানার ভবন, গুদাম কিংবা উৎপাদন স্থাপনা তৈরির প্রয়োজনও কমে যায়। ফলে ইস্পাত কাঠামো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কারখানা থাকলেও সেগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর মতো আদেশ পাওয়া যাচ্ছে না। এরই একটি উদাহরণ টাইগার স্টিলের ময়মনসিংহের ভালুকার কারখানা। প্রতিষ্ঠানটি ২০২১ সালে প্রায় ১৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে কারখানাটি গড়ে তুলেছিল। কিন্তু বর্তমানে সেটি সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। কর্মীর সংখ্যাও ২৫০ থেকে কমিয়ে প্রায় ১১০ জনে নামিয়ে আনতে হয়েছে। অর্থাৎ শুধু একটি শিল্পের বিক্রি কমেনি; উৎপাদন সক্ষমতা, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান—সবকিছুর ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে স্থানীয় শিল্পের সংকটের পুরো দায় শুধু চাহিদা কমে যাওয়ার নয়। শিল্প উদ্যোক্তাদের আরেকটি বড় অভিযোগ হলো, কিছু বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্প এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কিছু প্রতিষ্ঠান শুল্কমুক্ত সুবিধায় তৈরি ইস্পাত কাঠামো দেশে আনছে। এতে স্থানীয় কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে বিদেশি তৈরি পণ্যের অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় উদ্যোক্তারা ইতিমধ্যে আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তিতে বড় বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু একই পণ্য যদি বিদেশ থেকে তুলনামূলক সুবিধাজনক শর্তে দেশে আনা যায়, তাহলে স্থানীয় উৎপাদনের ওপর বিনিয়োগ ধরে রাখার প্রণোদনা দুর্বল হয়ে পড়ে। সরকারি বাণিজ্য তথ্যেও ইস্পাতের বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক কাঠামোয় পণ্যভেদে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়।
অবশ্য পুরো শিল্পটি যে একই মাত্রায় সংকটে পড়েছে, তা নয়। কিছু প্রতিষ্ঠান বিকল্প বাজার খুঁজে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, পিইবি স্টিল বর্তমানে প্রায় ৬০ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতায় চলছে; শিল্প প্রকল্পের আদেশ কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি দুই পালার বদলে এক পালায় উৎপাদন করছে। আবার প্রতিরক্ষা অবকাঠামো ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে নতুন আদেশও আসছে। অর্থাৎ বাজার পুরোপুরি অচল নয়, কিন্তু সামগ্রিক শিল্প বিনিয়োগ দুর্বল থাকায় স্বাভাবিক উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
দেশীয় পূর্বনির্মিত ইস্পাত শিল্পের বর্তমান সংকট তাই শুধু একটি শিল্পের বিক্রি কমে যাওয়ার ঘটনা নয়। এটি দেশের বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি কতটা কমেছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন ও বেসরকারি বিনিয়োগে গতি না ফিরলে এই শিল্পের চাহিদা দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কম। একই সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদক ও বিদেশি সরবরাহকারীদের জন্য শুল্কনীতিতে সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা না গেলে দেশে গড়ে ওঠা উৎপাদন সক্ষমতাও ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়বে শিল্প বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং দেশের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতার ওপর।

