ব্যবসায়িক বিরোধ দ্রুত মেটানোর জন্য আদালতের দীর্ঘ মামলা এড়িয়ে সালিশি বা ‘আরবিট্রেশন’ ব্যবস্থার ওপর ভরসা করেন দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চুক্তিতে সাধারণত এমন ধারা রাখা হয়, যাতে কোনো পক্ষ চুক্তি ভঙ্গ করলে আদালতে বছরের পর বছর মামলা না চালিয়ে নিরপেক্ষ সালিশি ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিরোধের সমাধান করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশে সেই ব্যবস্থাতেও এখন দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে। ফলে যে প্রক্রিয়াটি দ্রুত ও কার্যকর সমাধানের বিকল্প হিসেবে তৈরি হয়েছিল, সেটিই অনেক ক্ষেত্রে নতুন করে আইনি জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকের বেশি সময়ে হাইকোর্টে কয়েক হাজার সালিশি আবেদন জমা পড়েছে। এর সঙ্গে জড়িত অর্থের পরিমাণও কম নয়। কিন্তু এসব আবেদনের তুলনায় নিষ্পত্তির সংখ্যা অনেক কম। চলতি বছরের প্রথমার্ধেও শতাধিক নতুন আবেদন জমা পড়লেও বেশির ভাগেরই নিষ্পত্তি হয়নি। ব্যবসায়ীদের কাছে এর অর্থ হলো, বিরোধ তৈরি হওয়ার পর দ্রুত সমাধান পাওয়ার যে প্রত্যাশা নিয়ে তারা সালিশি ব্যবস্থায় যান, বাস্তবে সেই নিশ্চয়তা সবসময় পাওয়া যাচ্ছে না।
এই দীর্ঘসূত্রতার প্রভাব বোঝা যায় কয়েকটি বিরোধের দিকে তাকালেই। হংকংভিত্তিক একটি শিপিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি জাহাজভাঙা প্রতিষ্ঠানের বিরোধের মূল সিদ্ধান্ত যুক্তরাজ্যের সালিশি ট্রাইব্যুনালেই হয়ে গিয়েছিল। সেখানে বিদেশি প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে গিয়ে শুরু হয় নতুন আইনি প্রক্রিয়া। জেলা আদালতে দীর্ঘ সময় ধরে শুনানি চলার পর বিষয়টি হাইকোর্টে গড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত কয়েক বছর পার হয়ে যায়। একইভাবে মালয়েশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বিরোধেও সালিশি বোর্ড একসময় রায় দিয়েছিল, কিন্তু সেই রায় নিয়ে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। অর্থাৎ কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিরোধের মূল সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়ার পরও অর্থ আদায় বা রায় কার্যকর করতেই বছরের পর বছর লেগে যাচ্ছে। আবার কোথাও সালিশি বোর্ড গঠন করতেই দীর্ঘ সময় পার হচ্ছে। ইতালির একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরোধের ক্ষেত্রেও সালিশকারী নিয়োগের জন্য করা আবেদন নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। আন্তর্জাতিক ব্যবসায় সাধারণত একটি বাণিজ্যিক বিরোধ কয়েক মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির প্রত্যাশা থাকে। সেখানে বাংলাদেশে একই প্রক্রিয়া যদি বছরের পর বছর চলে, তাহলে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত, বিনিয়োগ এবং অর্থপ্রবাহ—সবকিছুর ওপরই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সালিশির ক্ষেত্রে কোনো পক্ষ সালিশকারী নিয়োগে ব্যর্থ হলে অনেক সময় হাইকোর্টের সহায়তা নিতে হয়। কিন্তু বাণিজ্যিক বিরোধের পাশাপাশি কোম্পানি, ব্যাংক, বিমা, ট্রেডমার্কসহ নানা ধরনের মামলা একই আদালতের ওপর চাপ তৈরি করছে। ফলে সালিশি সংক্রান্ত আবেদন দ্রুত শুনানি পাওয়ার সুযোগ কমে যায়। এর সঙ্গে বিচারক ও আইনজীবীদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সালিশি বিষয়ে বিশেষায়িত অভিজ্ঞতার ঘাটতিও একটি সমস্যা হিসেবে উঠে আসছে। আবার বিদেশে কোনো সালিশি রায় হলে সেটি বাংলাদেশে কার্যকর করার ক্ষেত্রেও আলাদা আইনি ধাপ রয়েছে। ১৯৫৮ সালের নিউইয়র্ক কনভেনশনের মাধ্যমে বিদেশি সালিশি রায় স্বীকৃতি ও কার্যকরের আন্তর্জাতিক কাঠামো তৈরি হলেও বাস্তবে কোনো দেশে সেই রায় কত দ্রুত কার্যকর হবে, সেটিও বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি বিরোধে শুধু মামলার খরচই বাড়ে না, দীর্ঘ সময় অর্থ আটকে থাকে, ব্যবসার পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয় এবং চুক্তি বাস্তবায়নের ঝুঁকি বাড়ে। একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী যখন কোনো দেশে কারখানা, অবকাঠামো বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন, তখন উৎপাদন খরচ বা বাজারের পাশাপাশি বিরোধ হলে দ্রুত আইনি প্রতিকার পাওয়া যাবে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেন।
এই কারণেই সালিশি ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা বাংলাদেশের বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে সেটি দ্রুত মেটানো যাবে না—এমন ধারণা তৈরি হলে বিনিয়োগকারীর ঝুঁকির হিসাব বদলে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, শুধু নতুন আইন করলেই হবে না; বাণিজ্যিক বিরোধের জন্য দক্ষ বিচারক, পর্যাপ্ত আদালত, প্রশিক্ষিত আইনজীবী এবং দ্রুত রায় কার্যকর করার ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। বাণিজ্যিক আদালত চালুর উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে কিছুটা গতি আনতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত সাফল্য নির্ভর করবে এসব ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা দ্রুত কাজ করছে তার ওপর। কারণ বিনিয়োগকারীর কাছে একটি দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের মূল্য শুধু কারখানা স্থাপনের সুযোগে নয়; সমস্যা তৈরি হলে সেই সমস্যার সমাধান কত দ্রুত পাওয়া যায়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সালিশি যদি আদালতের দীর্ঘসূত্রতার বিকল্প না হয়ে আরেকটি দীর্ঘ আইনি পথে পরিণত হয়, তাহলে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর আস্থার জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

