বাংলাদেশে নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবার বিস্তার হলেও মানুষের একটি বড় অংশ এখনো নগদের ওপরই বেশি ভরসা করে। কারণ ডিজিটাল লেনদেনে ভুল হলে টাকা ফেরত পাওয়া, প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত সমাধান পাওয়া কিংবা অভিযোগের নিষ্পত্তি—এসব নিয়ে আস্থার ঘাটতি রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশের মোট লেনদেনের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি হয়েছে নগদে। ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার বাড়লেও অর্থনীতির বড় অংশ এখনো নগদনির্ভর।
সমস্যা শুধু প্রযুক্তির নয়
বাংলাদেশে মোবাইল আর্থিক সেবা, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, কিউআর কোডসহ নানা ধরনের ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এসব ব্যবস্থা থাকলেই মানুষ নগদ ছেড়ে দেবে—বাস্তবে তা হচ্ছে না। এর একটি বড় কারণ, ডিজিটাল লেনদেনে কোনো ভুল বা সমস্যা হলে দ্রুত সমাধান পাওয়ার নিশ্চয়তা অনেক ক্ষেত্রেই নেই। ভুল নম্বরে টাকা চলে গেলে তা ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া জটিল হতে পারে। প্রতারণার শিকার হলেও টাকা ফেরত পেতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
একজন সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি খুব সহজ—নগদ টাকা হাতে থাকলে তিনি জানেন টাকা কোথায় আছে। কিন্তু ডিজিটাল লেনদেনে কোনো সমস্যা হলে কীভাবে টাকা ফেরত পাবেন, সেই নিশ্চয়তা না থাকলে নগদের ওপর আস্থা থেকেই যায়।
ডিজিটাল টাকা, কিন্তু নগদেই ফেরত
বাংলাদেশে মোবাইল আর্থিক সেবার ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। মানুষ বেতন, প্রবাসী আয় বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ডিজিটাল মাধ্যমে টাকা পাঠাচ্ছে। কিন্তু সেই টাকা অনেক সময় ডিজিটাল ব্যবস্থায় থাকছে না। প্রয়োজন হলেই নগদ তুলে নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ ডিজিটাল ব্যবস্থা এখনো অনেকের কাছে মূলত টাকা পাঠানোর মাধ্যম, দৈনন্দিন কেনাকাটা, সঞ্চয় বা ঋণ নেওয়ার পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক নিয়াজ আসাদুল্লাহর মতে, মানুষ ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করলেও অনেক ক্ষেত্রে এটিকে টাকা স্থানান্তরের মাধ্যম হিসেবেই দেখছে। ছোট ব্যবসায়ী বা স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য কোনো ভুল বা সমস্যার দ্রুত সমাধান না পাওয়ার আশঙ্কা ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয়।
ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য সুবিধা কোথায়?
নগদহীন অর্থনীতি গড়তে হলে শুধু গ্রাহককে ডিজিটাল লেনদেনে আনলেই হবে না। দোকানি, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, সরবরাহকারী ও পাইকার—পুরো লেনদেনের ব্যবস্থাকেই ডিজিটাল হতে হবে। একজন মুদি দোকানি কিউআর কোড রাখলেন, কিন্তু তাঁর সরবরাহকারী যদি শুধু নগদ টাকা চান, তাহলে ওই দোকানির কাছে ডিজিটাল টাকা রাখার সুবিধা কমে যায়। একইভাবে ডিজিটাল লেনদেনের পর টাকা তুলতে অতিরিক্ত খরচ হলে বা লেনদেনে সময় লাগলে ছোট ব্যবসায়ী আবার নগদের দিকেই ফিরে যেতে পারেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সায়েমা হক বিদিশার মতে, মানুষের আর্থিক জ্ঞান ও সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। অনেক মানুষ এখনো ডিজিটাল সেবা ব্যবহারের সময় ভুল করার ভয় পান। তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি ব্যবহারকারীর আস্থা তৈরিও গুরুত্বপূর্ণ।
নগদ কেন এখনো জনপ্রিয়?
নগদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—এতে কোনো মধ্যস্থতা নেই। টাকা হাতে থাকলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার করা যায়। কোনো অ্যাপ বন্ধ, ইন্টারনেট সমস্যা বা লেনদেন আটকে যাওয়ার ভয় থাকে না। অন্যদিকে ডিজিটাল লেনদেনে খরচ, প্রযুক্তিগত সমস্যা কিংবা টাকা আটকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে নগদই অনেকের কাছে নিরাপদ মনে হয়। এ কারণে শুধু কিউআর কোড বা মোবাইল ব্যাংকিং বাড়ালেই নগদ কমবে না। ডিজিটাল লেনদেনকে মানুষের কাছে আরও সহজ, সস্তা ও নিরাপদ করতে হবে।
আস্থার জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে নগদহীন অর্থনীতির জন্য এখন মূল চ্যালেঞ্জ অবকাঠামোর অভাব নয়। বরং ডিজিটাল ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা তৈরি করা। ভুল লেনদেন হলে দ্রুত টাকা ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা, প্রতারণার ঘটনায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা, সহজ অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং গ্রাহকের সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে মানুষ ডিজিটাল লেনদেনে বেশি আগ্রহী হবে। একই সঙ্গে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য লেনদেনের খরচ কমানো এবং ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে ব্যবসার সুবিধা বাড়ানোও জরুরি। একজন দোকানি যদি ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে সহজে ঋণ পান, ব্যবসার হিসাব তৈরি করতে পারেন কিংবা সরবরাহকারীর সঙ্গে সহজে লেনদেন করতে পারেন, তাহলে ডিজিটাল ব্যবস্থায় থাকার কারণও তৈরি হবে।
২০৩১ সালের লক্ষ্য কতটা বাস্তব?
বাংলাদেশের নগদহীন অর্থনীতির লক্ষ্য পূরণে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন প্রযুক্তি আছে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো—মানুষ ডিজিটাল ব্যবস্থাকে কতটা নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য মনে করছে। নগদ ব্যবস্থার বিকল্প তৈরি করতে হলে ডিজিটাল লেনদেনকে শুধু দ্রুত নয়, সমস্যার সময়ও নির্ভরযোগ্য করতে হবে। মানুষের কাছে যদি মনে হয় ভুল হলে টাকা ফেরত পাওয়া যাবে, প্রতারণা হলে দ্রুত ব্যবস্থা হবে এবং লেনদেনে বাড়তি ঝামেলা নেই, তখনই নগদের ওপর নির্ভরতা কমবে। বাংলাদেশের নগদহীন অর্থনীতির পথ তাই শুধু প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি হবে না। আস্থা তৈরি করতে পারাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

