এক দশক ধরে প্রায় নিয়মিত মুনাফা করা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন এবার বড় ধরনের নগদ সংকটে পড়েছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় গত চার মাসে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটির লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৮,৬৯৯ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন জ্বালানি তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানি করে দেশে সরবরাহ ও বাজারজাত করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দামে জ্বালানি কিনে দেশে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করায় প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক হিসাবে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
সংকট সামাল দিতে ব্যাংকে থাকা অর্থের পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য সংরক্ষিত টাকাও ব্যবহার করতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। এখন দেশের বাধ্যতামূলক ৬০ দিনের জ্বালানি মজুত ধরে রাখতে কার্যকরী মূলধন হিসেবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন বলে হিসাব করেছে বিপিসি। এর মধ্যে সরকারে কাছে ১৮,৬৯৯ কোটি টাকা চেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত বিপিসির পরিচালনা পর্ষদের সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, নগদ অর্থ দ্রুত কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে জ্বালানি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চলতি সংকটের মাত্রা বোঝা যায় মাসভিত্তিক লোকসানের হিসাব থেকে। মার্চে বিপিসির লোকসান হয়েছে ২ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। এপ্রিলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। মে মাসে লোকসান ছিল ২ হাজার ৬২১ কোটি টাকা এবং জুনে ৫ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা।
২৩ জুন পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী লোকসান ছিল ১৮ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। পরবর্তী হিসাবে মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা।
বিশেষ করে এপ্রিলে মোট চার মাসের লোকসানের প্রায় ৪২ শতাংশ হয়েছে। ওই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়লেও দেশের বাজারে জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল।
পরে সরকার জ্বালানির দাম বাড়ালেও আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি হওয়া বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে তা পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি বলে জানিয়েছে বিপিসি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অর্থনীতির অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম মনে করেন, আমদানি করা জ্বালানির বিল বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি। আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়াই এর মূল কারণ নয়।
তার ভাষায়, বাংলাদেশ এমন একটি যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য দিচ্ছে, যার সঙ্গে দেশটি সরাসরি জড়িত নয়।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর সময় বিপিসির বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে জমা ছিল ৩৬ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। জুনের শেষে সেই অর্থ কমে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৫২৪ কোটি টাকায়।
এই অর্থের একটি বড় অংশ ছিল বিভিন্ন তহবিলে রাখা। এর মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ প্রকল্পসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য সংরক্ষিত অর্থও ছিল।
জ্বালানি আমদানির কার্যকরী মূলধনের চাহিদা মেটাতে বিপিসি ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-২ প্রকল্প থেকে ৯ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা, অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা এবং বিবিধ আয় থেকে ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ব্যবহার করেছে। পাশাপাশি তফসিলি ব্যাংকে পড়ে থাকা অব্যবহৃত অর্থ থেকে আরও ৬৪০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম সচল রাখতে ১৫ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা সরিয়ে বা সংগ্রহ করেছে।
বিপিসির কাছে থাকা ১ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭১ লাখ টাকার ‘মূলধন সংরক্ষণ’ তহবিলও এখন নজরে এসেছে। চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে তিন মাস মেয়াদি স্থায়ী আমানত হিসেবে রাখা এই অর্থ মেয়াদ শেষে ভেঙে জ্বালানি আমদানির ঋণপত্র খোলার কাজে ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছিল বিপিসি।
তবে পরিচালনা পর্ষদ প্রস্তাবটি অনুমোদন করেনি। আন্তর্জাতিক হিসাবরক্ষণ মানদণ্ডের আলোকে বিষয়টি পরীক্ষা করার জন্য এটি অর্থ ও নিরীক্ষা কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে।
বর্তমান সংকট আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বিপিসির দীর্ঘদিনের মুনাফার ইতিহাসের কারণে। ২০১৫-১৬ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরের মধ্যে ৯ বছরই প্রতিষ্ঠানটি নিট মুনাফা করেছে।
এই সময়ে বিপিসির মোট নিট মুনাফা হয়েছে ৪৮ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। শুধু ২০২১-২২ অর্থবছরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি লোকসানে পড়েছিল।
এই সময়ে সরকারকে লভ্যাংশ হিসেবে ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা দিয়েছে বিপিসি। এ ছাড়া ২০২০-২১ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে বিপিসির উদ্বৃত্ত তহবিল থেকে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছিল।চলমান সংকটে বিপিসির ‘সাধারণ সংরক্ষণ তহবিল’ না থাকার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিপিসির দাবি, প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ ধরনের কোনো তহবিল গঠন করা হয়নি। অথচ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন আইনে এমন একটি তহবিল গঠনের সুযোগ রয়েছে।
আইন অনুযায়ী, সরকারের নির্ধারিত সীমার মধ্যে বিপিসি সংরক্ষণ তহবিল গঠন করতে পারে। প্রতি বছর মুনাফার একটি অংশও এই তহবিলে রাখা যেতে পারে। জরুরি পরিস্থিতি, দায় পরিশোধ, যন্ত্রপাতি ও সম্পদের মেরামত বা প্রতিস্থাপন এবং নতুন সম্পদ কেনার মতো কাজে তহবিলটি ব্যবহার করা যায়।
বর্তমান সংকট মোকাবিলায় তাই ৫ হাজার কোটি টাকার একটি সাধারণ সংরক্ষণ তহবিল গঠনের প্রস্তাব করেছে বিপিসি। প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণীতে থাকা জমাকৃত মুনাফা বা সঞ্চিত অর্থ থেকে প্রাথমিকভাবে এই তহবিল গঠন করা হবে।
এরপর ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে প্রতি বছর মুনাফার ৫০০ কোটি টাকা অথবা মুনাফার ২০ শতাংশ—যেটি কম—এই তহবিলে জমা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে পরিচালনা পর্ষদ এখনো প্রস্তাবটি অনুমোদন করেনি। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অর্থ ও নিরীক্ষা কমিটিকে বিষয়টি পর্যালোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতা, অন্যদিকে দেশে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি বিক্রির কারণে বিপিসির আর্থিক চাপ দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার করায় ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনাতেও চাপ তৈরি হতে পারে।
দীর্ঘদিন মুনাফা করার পর মাত্র চার মাসে বিপুল লোকসান তাই শুধু বিপিসির আর্থিক সংকট নয়, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও আমদানি সক্ষমতার জন্যও বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

