রাশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের ইনভয়েসসংক্রান্ত জটিলতায় রপ্তানি অর্থ আটকে থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া দেশের পোশাক কারখানাগুলোর পাওনা যেন আইনগতভাবে দায়বদ্ধ সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছ থেকেই আদায় করা হয়, এ বিষয়ে একমত হয়েছে দেশের পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন এবং একটি আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ড। একই সঙ্গে সীমিতসংখ্যক পক্ষের এই বিরোধের প্রভাব যেন গোটা পোশাকখাত ও দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কের ওপর না পড়ে, সে জন্য বিভ্রান্তিকর প্রচার এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছে উভয় পক্ষ।
এই বিরোধের সূত্রপাত ঘটে রাশিয়ার একটি খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় চল্লিশটি বাংলাদেশি সরবরাহকারীর মোট প্রায় চার কোটি ডলারের পাওনা রপ্তানি অর্থ পরিশোধ না হওয়াকে কেন্দ্র করে। স্থানীয় রপ্তানিকারকদের অভিযোগ ছিল, রাশিয়ার ওই ক্রেতার সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনে সংশ্লিষ্ট ফ্যাশন ব্র্যান্ডের ঢাকা কার্যালয় মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেছিল।
মঙ্গলবার এক যৌথ বিবৃতিতে পোশাকশিল্প সংগঠনের সভাপতি ও ওই ফ্যাশন ব্র্যান্ডের ক্রয় ও পরিবেশ-সামাজিক-প্রশাসন বিভাগের একজন পরিচালক জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলোর পাওনা-দেনা আইনগতভাবে দায়বদ্ধ সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গেই নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
সংশ্লিষ্ট এক বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে আলোচিত বিষয়টি মূলত চুক্তিবদ্ধ ও ইনভয়েসসংক্রান্ত কিছু বকেয়া দাবির সঙ্গে জড়িত, যেখানে ওই ফ্যাশন ব্র্যান্ড নিজে কোনো দেনাদার বা অর্থ পরিশোধে আইনগতভাবে বাধ্য পক্ষ নয় বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নিশ্চিত করেছে, বাংলাদেশে তাদের প্রত্যক্ষ সরবরাহকারী ও ব্যবসায়িক অংশীদারদের সব দায়-দেনা নিয়মিতভাবে এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ীই পরিশোধ করা হয়।
এ অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে পোশাকশিল্প সংগঠনটি মনে করে, সংশ্লিষ্ট দাবিগুলো সেই প্রতিষ্ঠানের কাছেই উত্থাপন করা উচিত, যারা প্রকৃতপক্ষে এই দায়ে আবদ্ধ। উভয় পক্ষই স্বীকার করেছে, ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলো একটি কঠিন বাণিজ্যিক পরিস্থিতির মুখোমুখি রয়েছে, এবং এ-সংক্রান্ত যেকোনো নিষ্পত্তি আলোচনা আইনগতভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত পক্ষের সঙ্গেই হওয়া উচিত বলে তারা একমত। পাশাপাশি নিজেদের আইনি অবস্থান অক্ষুণ্ণ রেখে প্রয়োজনে গঠনমূলক আলোচনায় সহায়তার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে ওই ফ্যাশন ব্র্যান্ড।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটির কিছু ক্রয়-প্রক্রিয়া পর্যালোচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের জন্য একটি স্থিতিশীল, পূর্বানুমানযোগ্য ও ন্যায্য পরিবেশ বজায় রাখা। এই পর্যালোচনা কোনোভাবেই পোশাক প্রস্তুতকারকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ছিল না এবং এটি প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব চুক্তিভিত্তিক সব দায়বদ্ধতা মেনে চলার অঙ্গীকারকে প্রভাবিত করে না বলেও জানানো হয়েছে।
পোশাকশিল্প সংগঠন ও ওই ফ্যাশন ব্র্যান্ড একমত হয়েছে যে, বর্তমানে ব্র্যান্ডটির সঙ্গে ব্যবসায়িকভাবে যুক্ত সাড়ে তিনশর বেশি পোশাক প্রস্তুতকারকসহ দেশের গোটা পোশাকখাতের স্বার্থ যেন সীমিতসংখ্যক পক্ষের এই বিরোধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তাই তারা মনে করে, ঢালাও বা বিভ্রান্তিকর কোনো প্রচার এড়িয়ে চলা জরুরি, যা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অন্য প্রস্তুতকারক, কর্মী কিংবা প্রতিষ্ঠান দুটির মধ্যকার দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
একটি সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে পোশাকশিল্প সংগঠনটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, কর্তৃপক্ষ ও শিল্প অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে বলেও জানানো হয়েছে বিবৃতিতে, যার মধ্যে থাকবে ওই ফ্যাশন ব্র্যান্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যেকোনো অনুচিত হয়রানি, চাপ বা ভিত্তিহীন আইনি জটিলতা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টিও। তবে বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত আইনানুগ প্রক্রিয়ার স্বাধীনতাকে কোনোভাবে খর্ব করবে না এবং আইনগতভাবে দায়ী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যেকোনো পক্ষের বৈধ দাবি উত্থাপনের অধিকারও অব্যাহত থাকবে।
সবশেষে বিবৃতিতে দুই পক্ষ তাদের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্ব এবং বাংলাদেশের পোশাকখাতের প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের প্রতি যৌথ প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। বর্তমান বিরোধের একটি সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধান নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশে নিরাপদ, স্থিতিশীল ও নিরবচ্ছিন্ন ব্যবসায়িক পরিবেশ বজায় রাখতে একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে উভয় প্রতিষ্ঠান।
বিশ্লেষকদের মতে, এই যৌথ বিবৃতি বাংলাদেশের পোশাকখাতে আন্তর্জাতিক ক্রেতা-বিক্রেতা সম্পর্কের জটিলতা নিরসনে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে, যেখানে বিচ্ছিন্ন কোনো বাণিজ্যিক বিরোধ যেন পুরো শিল্পের সুনাম বা আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে না পারে, সে বিষয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

