যুক্তরাষ্ট্রের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আগামী ১৩ বছরে ১১৭ চালান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি কিনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সরকারের সঙ্গে সরকারের ব্যবস্থাপনার আওতায় এ গ্যাস আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
তবে চুক্তিটি নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ গ্যাস সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গানভর ইউএসএ এলএলসি প্রাথমিক প্রস্তাবের তুলনায় পরে এলএনজির দাম বাড়িয়েছে। এরপরও বুধবার সেই বাড়তি দামেই আমদানির প্রস্তাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে বুধবার সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবটি অনুমোদন করা হয়েছে। তবে একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কীভাবে সরকারের সঙ্গে সরকারের ব্যবস্থাপনায় এ চুক্তি হচ্ছে, সে বিষয়ে বৈঠকে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির অংশ হিসেবেই আমেরিকা থেকে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব ছাড়ার কিছু আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ চুক্তি সই করেছিল। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়িয়ে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
এলএনজি আমদানির প্রাথমিক প্রস্তাবে গানভর ইউএসএ এলএলসি জানিয়েছিল, ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত প্রতি এমএমবিটিইউ গ্যাসের দাম হবে জেকেএমের সঙ্গে ০.১০ মার্কিন ডলার যোগ করে। আর ২০২৯ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত দাম নির্ধারণের প্রস্তাব ছিল হেনরি হাবের ১২২ শতাংশের সঙ্গে ৫.৩৫ মার্কিন ডলার যোগ করে।
কিন্তু পেট্রোবাংলার সঙ্গে দর-কষাকষির সময় প্রতিষ্ঠানটি দাম বাড়িয়ে দেয়। নতুন প্রস্তাবে ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের জন্য জেকেএমের সঙ্গে ০.৮৭৫ মার্কিন ডলার যোগ করে দাম নির্ধারণ করা হয়। আর ২০২৯ থেকে ২০৩৮ সালের জন্য হেনরি হাবের ১২১ শতাংশের সঙ্গে ৫.২০ মার্কিন ডলার যোগ করে দাম নির্ধারণ করা হয়।
দাম পুনর্নির্ধারণের কারণে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে এলএনজি কেনার প্রস্তাব অনুমোদনের উদ্যোগ স্থগিত করেছিল সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। শেষ পর্যন্ত বুধবার বাড়তি দামেই প্রস্তাবটি অনুমোদন দেওয়া হলো।
অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালে পাঁচ চালান, ২০২৭ সালে ছয় চালান এবং ২০২৮ সালে তিন চালান এলএনজি কেনা হবে। এসব চালানের দাম হবে জেকেএমের সঙ্গে প্রতি এমএমবিটিইউতে ০.০৮৭৫ মার্কিন ডলার যোগ করে। এরপর ২০২৯ সালে আরও তিন চালান এবং ২০২৯ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ১০টি করে চালান কেনা হবে। এসব চালানের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে হেনরি হাবের ১২১ শতাংশের সঙ্গে প্রতি এমএমবিটিইউতে ৫.২০ মার্কিন ডলার যোগ করে।
গ্যাসের বাড়তি চাহিদা মেটাতে আরও ছয় চালান এলএনজি আমদানির অনুমোদন দিয়েছে কমিটি। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যের ব্ল্যাককিউব ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড সরবরাহ করবে দুটি চালান, প্রতি এমএমবিটিইউর দাম ১৫.৫০ মার্কিন ডলার। ওমানের ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনাল এসপিসি দুটি চালান সরবরাহ করবে জেকেএমের সঙ্গে ০.৫৪ মার্কিন ডলার যোগ করে। আর হংকংয়ের ঝেনইউ শিপিং কোম্পানি লিমিটেডের দুটি চালানের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি এমএমবিটিইউ ১৪.৯৫ মার্কিন ডলার।
একই বৈঠকে এলএনজির বাইরে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও কৃষি উপকরণ আমদানিরও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সৌদি আরবের সাবিক অ্যাগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস কোম্পানি থেকে ৪০ হাজার টন দানাদার ইউরিয়া সার কেনা হবে। এতে মোট ব্যয় হবে ২০৯ কোটি টাকা এবং প্রতি টনের দাম পড়বে ৪২১.৬৭ মার্কিন ডলার।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের জন্য ৪০ হাজার টন ডিএপি সার কেনার প্রস্তাবও অনুমোদন পেয়েছে। ওসিপি নিউট্রিক্রপস থেকে এ সার কিনতে মোট ব্যয় হবে ৪৪১ কোটি টাকা। প্রতি টনের দাম হবে ৮৯১.৬৭ মার্কিন ডলার। একই প্রতিষ্ঠান থেকে ৩০ হাজার টন টিএসপি সার কেনা হবে ২৫১ কোটি টাকায়। প্রতি টনের দাম পড়বে ৬৭৭.৩৩ মার্কিন ডলার।
এ ছাড়া খাদ্য অধিদপ্তরের জন্য ভিয়েতনাম থেকে এক লাখ টন অ-সুগন্ধি সিদ্ধ চাল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ভিয়েতনাম সাদার্ন ফুড করপোরেশন চাল সরবরাহ করবে। এতে মোট ব্যয় হবে ৫১৫ কোটি টাকা এবং প্রতি টনের দাম পড়বে ৪১৬ মার্কিন ডলার।
ইন্দোনেশিয়া থেকে ২৫ হাজার টন চিনি আমদানিতে ব্যয় হবে ১৫৭ কোটি টাকা। প্রতি টনের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫১৪ মার্কিন ডলার। একই দেশ থেকে পিটি ট্রিনিটি ক্যাহায়া এনার্জির মাধ্যমে ২০ হাজার টন পরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানিতে ব্যয় হবে ২৮২ কোটি টাকা। প্রতি লিটারের দাম পড়বে ১.১৫০ মার্কিন ডলার।
রাজশাহীর নাবিল নাবা ফুডস লিমিটেডের কাছ থেকে ১০ হাজার টন মসুর ডাল কেনার প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়েছে। এতে মোট ব্যয় হবে ৭৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। প্রতি কেজি ডালের দাম পড়বে ৭৮.৯৬ টাকা।
এর আগে বুধবার অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকেও এলএনজি আমদানির কয়েকটি প্রস্তাব নীতিগত অনুমোদন পায়। ওই বৈঠকে হংকংয়ের ঝেনইউ শিপিং কোম্পানি লিমিটেড, মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস এলএনজি লিমিটেড, চীনের রানজে হোল্ডিংস গ্রুপস লিমিটেড এবং যুক্তরাষ্ট্রের ডারাব ইনকরপোরেশন থেকে দুটি করে এলএনজি চালান কেনার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।

