বাংলাদেশে দরিদ্র পরিবার শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কতটা কার্যকর—তা যাচাই করতে বড় পরিসরে একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ফলাফল বলছে, মুঠোফোনের তথ্য ব্যবহার করে তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেলটি প্রচলিত বাড়ি বাড়ি জরিপ পদ্ধতির তুলনায় কম সফল হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা’। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি ও জনসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব নিয়ে প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এই পরীক্ষার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
কীভাবে পরীক্ষা চালানো হয়েছিল?
সরকার একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে এই পরীক্ষা চালায়। লক্ষ্য ছিল সবচেয়ে দরিদ্র ২১ শতাংশ পরিবারকে শনাক্ত করে তাদের নগদ সহায়তা কর্মসূচির আওতায় আনা।
প্রথমে ৫ হাজার পরিবারের ওপর সরাসরি জরিপ চালানো হয়। এর মাধ্যমে প্রকৃত দারিদ্র্যের চিত্র নির্ধারণ করেন গবেষকেরা। এরপর সহায়তা পাওয়ার সম্ভাব্য ১ লাখ ৬ হাজার পরিবারকে বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে ক্রমানুসারে সাজাতে দুটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
একটি ছিল প্রচলিত পদ্ধতি, যেখানে পরিবারের সম্পদ ও অন্যান্য আর্থিক সূচক বিবেচনা করে দরিদ্রতা নির্ধারণ করা হয়। অন্য পদ্ধতিতে মুঠোফোনের তথ্য ব্যবহার করা হয়।
মুঠোফোনভিত্তিক পদ্ধতিতে ১ হাজার ৫০০টির বেশি তথ্যের ধরন বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য দরিদ্র পরিবার শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়।
কিন্তু পরীক্ষার ফলাফলে প্রচলিত পদ্ধতিই এগিয়ে ছিল। প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলোর ৫২ শতাংশকে শনাক্ত করতে পেরেছে বাড়ি বাড়ি জরিপভিত্তিক পদ্ধতি। বিপরীতে মুঠোফোনের তথ্যনির্ভর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শনাক্ত করতে পেরেছে মাত্র ৩২ শতাংশ।
এমনকি কোনো তথ্য বিশ্লেষণ ছাড়াই এলোমেলোভাবে পরিবার বাছাই করা হলে ২১ শতাংশ দরিদ্র পরিবার শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকত।
মুঠোফোনভিত্তিক পদ্ধতিতে ৬ শতাংশ পরিবারের কোনো তথ্যই পাওয়া যায়নি। এ পদ্ধতিকে ন্যায্য মনে করেছেন মাত্র ৪৫ শতাংশ সহায়তা পাওয়া ব্যক্তি।
বিশ্বব্যাংক বলছে, মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয় তথ্যের ভিত্তিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকারিতা যাচাই করা জরুরি। কোনো একটি পরিবেশে ভালো ফল দেওয়া প্রযুক্তি অন্য পরিবেশে একইভাবে কাজ নাও করতে পারে।
চিকিৎসাক্ষেত্রে আবার সফল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
তবে বাংলাদেশের সব ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফলাফল নেতিবাচক নয়। চোখের ডায়াবেটিসজনিত রোগ শনাক্তের ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার ইতিবাচক ফল দিয়েছে।
ডায়াবেটিসের কারণে চোখের রেটিনায় যে ক্ষতি হয়, তা দ্রুত শনাক্ত করা না গেলে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশে এই রোগ শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহায়িত পরীক্ষা চালুর পর বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রতিদিন পরীক্ষার সংখ্যা ৩৯.৫ শতাংশ বেড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে এটিকে বিশ্বজুড়ে জনসেবায় বাস্তব সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকর ব্যবহারের মাত্র দুটি উদাহরণের একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য উদাহরণটি ভারতের তেলেঙ্গানায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস, যা কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি কমাতে সহায়তা করেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নীতিমালা এখনো গড়ে উঠছে
বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের নীতিগত কাঠামোও এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ এবং ‘অ্যাসপায়ার টু ইনোভেট’ কর্মসূচির মাধ্যমে জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি প্রণয়নের আগেই দেশে বিভিন্ন ডিজিটাল সরকারি সেবা চালু হয়েছিল।
২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের জন্য প্রস্তাবিত খসড়া জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিতে চারটি প্রতিষ্ঠান গঠনের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো জাতীয় তথ্য ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, স্বাধীন তদারকি কমিটি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন সেল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উদ্ভাবন তহবিল।
প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম শুরু করেনি বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক।
প্রযুক্তি ব্যবহারে আরও পিছিয়ে বাংলাদেশ
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার আরও কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও উঠে এসেছে। আয়ের তুলনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংক্রান্ত কার্যক্রমে বাংলাদেশ পাকিস্তান, নাইজেরিয়া ও ভিয়েতনামের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের পোশাক কারখানাগুলোতেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাপড় কাটা ও সেলাইয়ের প্রযুক্তির ব্যবহার খুব সীমিত। এর অন্যতম কারণ, এখনো অনেক ক্ষেত্রে মানুষের শ্রমের খরচ তুলনামূলকভাবে কম।
বড় বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন শর্ত ও তা মেনে চলার ব্যয় বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইন্টারনেট সুবিধা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ মুঠোফোননির্ভর যোগাযোগের পাশাপাশি কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্রাজিল, নাইজেরিয়া ও রুয়ান্ডার সঙ্গেও বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ইউরোপের একটি আঞ্চলিক সংস্থার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-বিষয়ক চুক্তি অনুমোদনেরও পরিকল্পনা করছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিতে সাধারণ মানুষের মতামত যুক্ত করতে বাইরের পরামর্শক পরিষদ গঠন করা অল্প কয়েকটি দেশের মধ্যেও বাংলাদেশ রয়েছে। কানাডা ও ফ্রান্সের নামও এ তালিকায় রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি হুমকি, নাকি সুযোগ?
বিশ্বব্যাংকের সামগ্রিক মূল্যায়ন অবশ্য বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আশাব্যঞ্জক। প্রতিবেদনের হিসাবে, এসব দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে ১০টির মধ্যে একটিরও কম চাকরি পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিপরীতে ধনী দেশগুলোতে এ ঝুঁকি এক-তৃতীয়াংশের বেশি।
প্রতিবেদন বলছে, প্রায় প্রতি ছয়টি চাকরির মধ্যে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে হারিয়ে যাওয়ার বদলে আরও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য নিজেদের বিশাল তথ্যকেন্দ্র বা নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল তৈরি করাও জরুরি নয়। ছোট আকারের এবং ইন্টারনেট-নির্ভরতা কম এমন প্রযুক্তি দিয়েই অনেক দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুরু করতে পারে।
বাংলাদেশের পরীক্ষাটি তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে—প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সেটি ব্যবহারের আগে স্থানীয় বাস্তবতা, তথ্যের মান এবং নির্ভুলতা যাচাই করা জরুরি। একই প্রযুক্তি এক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলেও অন্য ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অন্ধভাবে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান নয়, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী যাচাই করে ব্যবহার করাই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ।

