বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ধাক্কায় দেশজুড়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা এখন চরম সংকটে। পাবনার একজন উদ্যোক্তার ওয়ার্কশপে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় জমছে অর্ডারের স্তূপ, ধামরাইয়ের একটি ছোট জুতা কারখানায় শ্রমিকদের বসে থাকতে হচ্ছে বিদ্যুৎ ফেরার অপেক্ষায়, আর কেরানীগঞ্জের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিটে উৎপাদন থমকে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহই করা যাচ্ছে না।
এই প্রতিষ্ঠানগুলো সবই ছোট ও মাঝারি আকারের। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা রপ্তানিকারকদের মতো জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখার সামর্থ্য এদের নেই। ফলে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে তাদের উৎপাদনশীলতা ও আয় দুটোই কমছে। কোনো কোনো এলাকায় এখন দিনের প্রায় অর্ধেক সময় ধরেই লোডশেডিং চলছে।
ধামরাই বিসিক শিল্পনগরীর একটি জুতা তৈরির কারখানার একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে ঠিকমতো উৎপাদন চালানো যাচ্ছে না, ফলে সময় নষ্ট হচ্ছে এবং কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিতে গত তিন বছরে এমনিতেই উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে বলে জানান তিনি, আর এখন ক্রেতারাও অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছেন। বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটে উৎপাদন বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি খরচও বেড়ে চলেছে বলে জানান তিনি।
দেশে কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ, যেগুলো মোট দেশজ উৎপাদনের ৩০ শতাংশের বেশি অবদান রাখে এবং প্রায় ৩ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে শুরু করে ওয়েল্ডিংয়ের দোকান, চামড়াজাত পণ্য প্রস্তুতকারী ও পাড়ার লন্ড্রি—এসব ছোট ব্যবসাই দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। একই পরিমাণ পণ্য উৎপাদনে এখন খরচ বেশি হচ্ছে, সরবরাহে সময় লাগছে বেশি, আর কিছু উদ্যোক্তাকে শ্রমিকদের মজুরি দিতে নিজেদের সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে।
পাবনার একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা জানান, স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক দুই থেকে তিন হাজার টাকা আয় করতে পারলেও লোডশেডিংয়ের কারণে তা এখন অনেক কমে গেছে। তাঁর চারটি ভারী মেশিনের মধ্যে দুটি লেদ মেশিন থাকলেও বেশিরভাগ দিন তিন থেকে চার ঘণ্টা মেশিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। গত ৩০ বছর ধরে ব্যবসায় থাকা এই উদ্যোক্তা জানান, এখন সঞ্চয় ভেঙে শ্রমিকদের বেতন দিতে হচ্ছে, আর এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়বে।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে প্রকৃত উৎপাদন হচ্ছে তার প্রায় অর্ধেক। কক্সবাজারে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় গত কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে, যার প্রভাবে কমেছে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও। গত ১১ আগস্ট সারাদেশে লোডশেডিং সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে, প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছায়।
কেরানীগঞ্জের একটি ওয়ার্কশপের মালিক জানান, দিনের অর্ধেক সময় তারা বিদ্যুৎ পান না, তাই দিনের বদলে রাতে কাজ করার চেষ্টা করছেন। তবু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। যে কাজ আগে ৪০ দিনে শেষ করা যেত, এখন তা শেষ করতে দুই মাসের বেশি সময় লেগে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। এরপরও শ্রমিক ও কর্মচারীদের বেতন বাবদ প্রতি মাসে চার লাখ টাকা দিতে হচ্ছে তাঁকে, যদিও উৎপাদন কার্যত থমকে আছে।
স্থায়ী মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি হ্রাস, বেসরকারি খাতে দুর্বল বিনিয়োগ ও কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো নানামুখী অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেই এখন এই বিদ্যুৎ সংকটের নতুন ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের।
খুলনার একটি ছোট লেদ ওয়ার্কশপের মালিক পাওয়ার টিলার, ইজিবাইক ও শ্যালো ইঞ্জিনচালিত যানবাহনের যন্ত্রাংশ তৈরি করেন। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক আট থেকে দশটি অর্ডার পেয়ে সব খরচ বাদ দিয়ে দিনে এক থেকে দেড় হাজার টাকা আয় করতে পারতেন তিনি। কিন্তু এখন খরচই মেটাতে পারছেন না বলে জানান তিনি। বিদ্যুৎসহ তাঁর মাসিক ব্যয় প্রায় ২০ হাজার টাকা, অথচ গত ১০ দিনে আয় করেছেন মাত্র প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। বিদ্যুৎ চলে গেলে তিনি ও তাঁর সহকর্মী নাট-বল্টু পরিষ্কারের মতো ছোটখাটো কাজে সময় কাটাচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে এসএমই ফাউন্ডেশনের একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, নানা চ্যালেঞ্জের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাগুলো এমনিতেই ঝুঁকিতে রয়েছে, আর লোডশেডিং তাদের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত করে সংকট আরও গভীর করছে। তাঁর মতে, ঠিকমতো উৎপাদন করতে না পারলে এসব প্রতিষ্ঠান পণ্য বাজারজাত করতে পারবে না, ঋণের কিস্তিসহ অন্যান্য বাধ্যবাধকতা মেটানোর মতো আয়ও করতে পারবে না—যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতিতেই ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

