সুদের হার কমে গেল, কিন্তু ব্যবসায়ী কি সঙ্গে সঙ্গে নতুন কারখানা করবেন? নতুন মেশিন কিনবেন? নাকি ঋণের খরচ কিছুটা কমলেও তিনি আগের মতোই অপেক্ষা করবেন বাজারের চাহিদা বাড়ার, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার কিংবা অর্থনৈতিক পরিবেশ আরও স্থির হওয়ার? বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতিতে এই প্রশ্নটিই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে নীতিসুদ ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯.৫০ শতাংশ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবেও এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগ বাড়ানো। কিন্তু একই সময়ে বেসরকারি ঋণের চাহিদা এতটাই দুর্বল যে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণপ্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬.৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। অর্থাৎ সমস্যা শুধু ঋণের দাম বেশি কি না, তা নয়; বড় প্রশ্ন হলো ব্যবসায়ীরা এখন ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করার মতো যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস পাচ্ছেন কি না।
সাধারণ হিসাবটি অবশ্য খুব সহজ। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান কারখানা সম্প্রসারণ করবে, নতুন যন্ত্রপাতি কিনবে বা উৎপাদন বাড়াবে সেই বিনিয়োগ থেকে যে আয় হবে, তার তুলনায় ঋণের সুদ কম হলে প্রকল্পটি বেশি লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই সুদের হার কমলে ব্যবসার অর্থায়ন ব্যয় কমে, ভবিষ্যৎ মুনাফার হিসাব কিছুটা স্বস্তিদায়ক হয় এবং নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বাড়ে। একই কারণে এসএমই উদ্যোক্তা থেকে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান সবাই কম সুদের ঋণকে স্বাগত জানায়। কিন্তু এই সূত্র তখনই কাজ করে, যখন উদ্যোক্তার মনে হয় উৎপাদন বাড়ালে পণ্য বিক্রি হবে এবং ভবিষ্যতে সেই বিনিয়োগ থেকে পর্যাপ্ত আয় আসবে। বাজারে চাহিদা দুর্বল থাকলে ১৪ শতাংশের ঋণ ১২ শতাংশে নামলেও অনেক উদ্যোক্তা নতুন ঋণ নেওয়ার বদলে পুরোনো ঋণ পরিশোধ করতেই বেশি আগ্রহী হতে পারেন।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঋণচিত্র এই দ্বিতীয় বাস্তবতাটিই সামনে আনছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৫ শতাংশের নিচে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অর্থনীতির ধীর পুনরুদ্ধারের সময়ে বিনিয়োগের আগ্রহ কম থাকায় ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি ঋণপ্রবাহের লক্ষ্য ৬.৮ শতাংশ করা হয়েছে। এর আগে জুন ২০২৬ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮.৫ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার চেয়ে এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঋণ নেওয়ার আগ্রহ ও বিনিয়োগের চাহিদা।
এখানে সুদের হারের বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ সুদ, মূল্যস্ফীতি এবং ব্যবসার অনিশ্চয়তা উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে কঠিন করেছে। একটি ব্যাংকের ৩০ জুন ২০২৬ থেকে কার্যকর ঋণহার দেখলেই বিষয়টি বোঝা যায় বড় শিল্পের মেয়াদি ঋণ এবং নন-প্রোগ্রামভুক্ত কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের ঋণের হার ১৪.৫০ শতাংশ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিসুদ কমালেই ব্যবসায়ীর হাতে সঙ্গে সঙ্গে সমপরিমাণ কম সুদের ঋণ পৌঁছে যাচ্ছে এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। ব্যাংকের নিজস্ব তহবিলের খরচ, আমানতের সুদ, ঝুঁকি মূল্যায়ন, খেলাপি ঋণের ঝুঁকি এবং গ্রাহকের ধরন সবকিছু মিলেই শেষ পর্যন্ত ঋণের সুদ নির্ধারিত হয়।
আর এখানেই বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি রয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতা শুধু সুদের কারণে তৈরি হয়নি। সিপিডির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দুর্বল ব্যবসায়িক আস্থা, জ্বালানি সংকট, উচ্চ ঋণব্যয়, ধীর রপ্তানি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা সব মিলেই উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগ থেকে দূরে রাখছে। ২০২৬ সালের জুনে সিপিডি জানায়, এপ্রিল মাসে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে গিয়েছিল। একই সময়ে সরকারের ব্যাংকনির্ভর ঋণ বাড়লে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থের জোগান আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বিনিয়োগের সামগ্রিক চিত্রও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। সিপিডির হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২২.০৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যেখানে আগের বছর ছিল প্রায় ২৪ শতাংশ। সংগঠনটি বলছে, বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য বেসরকারি বিনিয়োগের হার আরও অনেক বেশি হওয়া দরকার। ফলে এখন যদি সুদ কমানো হয়, সেটিকে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের একটি দরজা হিসেবে দেখা যেতে পারে; কিন্তু দরজাটি খুললেই উদ্যোক্তা ভেতরে ঢুকবেন এমন নিশ্চয়তা নেই। তাঁকে আগে দেখতে হবে সামনে ক্রেতা আছে কি না, উৎপাদনের খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকবে কি না, বিদ্যুৎ ও গ্যাস পাওয়া যাবে কি না এবং আগামী কয়েক বছর নীতিমালা একই থাকবে কি না।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ পরিস্থিতি বিশ্লেষণও একই ধরনের সংকেত দেয়। সংস্থাটি বলছে, দেশের প্রবৃদ্ধি ধীর হয়েছে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল রয়েছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ নিয়ন্ত্রক ব্যয়, অবকাঠামোগত সমস্যা ও অর্থায়নে সীমিত সুযোগের মুখে আছে। তাই শুধু ঋণের খরচ কমানোর বদলে ব্যবসার পরিবেশ সহজ করা, প্রতিযোগিতা বাড়ানো, বিদ্যুৎ সরবরাহ নির্ভরযোগ্য করা এবং নীতির অনিশ্চয়তা কমানো জরুরি। অর্থাৎ সুদের হার বিনিয়োগের একটি চালক, কিন্তু একমাত্র চালক নয়।
অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমানো বা স্থির রাখার পাশাপাশি ব্যাংকঋণের সুদ কীভাবে বাস্তবে কমছে, সেটিও বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। চলতি আগস্টেও ভারতের কিছু ব্যাংক ঋণের বেঞ্চমার্ক হার কমিয়েছে, আবার অন্য কিছু ব্যাংক উল্টো হার বাড়িয়েছে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সিদ্ধান্ত থেকে গ্রাহকের চূড়ান্ত ঋণহারে পৌঁছাতে একটি সময় লাগে এবং সব ব্যাংক একই গতিতে প্রতিক্রিয়া দেখায় না।
বাংলাদেশের জন্য তাই আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত, সুদের হার কত হলো শুধু তা নয়; বরং সুদের হার কমার পর ঋণের চাহিদা কতটা বাড়ল এবং সেই ঋণ কোথায় গেল। যদি নতুন ঋণ মূলত পুরোনো ঋণ পুনঃঅর্থায়ন, চলতি মূলধনের ঘাটতি মেটানো বা আগের ক্ষতি সামলাতে ব্যবহৃত হয়, তাহলে ঋণপ্রবাহ বাড়লেও নতুন উৎপাদনক্ষমতা তৈরি হবে না। কিন্তু যদি অর্থ যায় নতুন কারখানা, আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি, রপ্তানিমুখী উৎপাদন কিংবা উৎপাদনশীল এসএমই খাতে, তখন সেই ঋণ ভবিষ্যতের আয় ও কর্মসংস্থান তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজের সাম্প্রতিক পর্যালোচনাতেও বেসরকারি ঋণের দুর্বল প্রবৃদ্ধিকে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আরেকটি বিষয়ও ভুলে গেলে চলবে না অর্থনীতিতে সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত সবসময় ঝুঁকিমুক্ত নয়। বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এখনো উঁচু পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তাই একদিকে প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগে গতি আনতে চাচ্ছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক লেনদেনের ওপর নজর রাখছে। অতিরিক্ত দ্রুত সুদ কমালে বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়তে পারে, কিন্তু উৎপাদন না বাড়লে সেই অর্থ পণ্যের চাহিদা বাড়িয়ে আবার মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে সুদ কমানোর সাফল্য মাপতে শুধু ঋণের পরিমাণ দেখা যথেষ্ট নয়; দেখতে হবে সেই ঋণের বিপরীতে উৎপাদন, বিনিয়োগ, আমদানি করা মূলধনি যন্ত্রপাতি এবং কর্মসংস্থান কতটা বাড়ছে।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুদের হার কমানো প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু সেটি একা বিনিয়োগের চাকা ঘোরানোর জন্য যথেষ্ট নয়। উদ্যোক্তা তখনই বড় অঙ্কের ঋণ নেবেন, যখন তিনি বিশ্বাস করবেন যে আগামী কয়েক বছর ব্যবসার পরিবেশ মোটামুটি স্থির থাকবে, উৎপাদনের খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকবে, ব্যাংকিং ব্যবস্থা নির্ভরযোগ্যভাবে অর্থ দেবে এবং তাঁর পণ্যের বাজার থাকবে। তাই নীতিসুদের ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমানোকে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের শুরু হিসেবে দেখা যায়, শেষ সমাধান হিসেবে নয়। এখন বাংলাদেশের জন্য বড় পরীক্ষা হলো কম সুদের সুযোগকে কীভাবে বাস্তব উৎপাদন, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে পরিণত করা যায়। কারণ ব্যবসায়ীকে ঋণ দেওয়াই নীতির সাফল্য নয়; সেই ঋণ দিয়ে ব্যবসায়ী নতুন কিছু তৈরি করতে শুরু করলেই আসল সাফল্য দেখা যাবে।

