দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্প—বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত সংযোগকারী এমআরটি লাইন-১—এর নির্মাণ ব্যয় প্রায় ১৩০ শতাংশ বাড়িয়ে এক লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছে প্রকল্পটি বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে ব্যয়ের দিক থেকে এটি হবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম উন্নয়ন প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরই। বর্তমানে চালু থাকা একমাত্র মেট্রোরেল লাইনের তুলনায় এই সংশোধিত ব্যয় প্রায় চার গুণ বেশি।
ডিএমটিসিএল ও পরিকল্পনা কমিশনের ভাষ্যমতে, ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো দরপত্র প্রক্রিয়ায় ঠিকাদারদের প্রাক্কলনের চেয়ে অনেক বেশি দর প্রস্তাব করা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের প্রভাবও। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, একই সময়ে অন্য একটি মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয়—যা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে—সম্প্রতি প্রায় দুই হাজার ২১৮ কোটি টাকা কমিয়ে আনা হয়েছে, যা এমআরটি লাইন-১-এর ব্যয় বৃদ্ধির বিপরীতমুখী চিত্র তুলে ধরে।
৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পটি ২০১৯ সালে অনুমোদিত হয়েছিল প্রায় ৫২ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে, বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। গত মঙ্গলবার সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের মাধ্যমে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো সংশোধিত প্রস্তাবে বাস্তবায়নের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। এতে জাপানি ঋণের অংশ প্রায় ১১৭ শতাংশ বাড়িয়ে ৮৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা এবং সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন প্রায় ১৬৯ শতাংশ বাড়িয়ে ৩৫ হাজার ২৫৯ কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সংস্থাটি নিজেই জানিয়েছিল ব্যয় ৮৩ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৯৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা হতে পারে—অর্থাৎ সাত মাসের ব্যবধানে সেই প্রাক্কলনও ছাড়িয়ে গেছে নতুন প্রস্তাব।
প্রকল্পটিকে মোট ১২টি পৃথক নির্মাণ প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে। একটি উদাহরণে দেখা যায়, রামপুরা থেকে নতুন বাজার পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ অংশের একটি প্যাকেজের মূল ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা, যা পরে জাপানি পরামর্শক সংস্থার প্রাক্কলনে দাঁড়ায় প্রায় ১৩ হাজার ২৬৬ কোটি টাকায়। কিন্তু দরপত্র আহ্বানের পর জাপানের একটি যৌথ উদ্যোগ সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে প্রায় ১৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকার প্রস্তাব দেয়। একইভাবে আরেকটি পাতাল অংশের প্যাকেজে মূল ব্যয় প্রায় সাড়ে চার হাজার ৬০৫ কোটি টাকা ধরা হলেও দরপ্রস্তাব আসে প্রায় ১০ হাজার ৮২২ কোটি টাকার। সব মিলিয়ে ১২টি প্যাকেজের মূল ব্যয় প্রায় ৩৭ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে সর্বশেষ প্রাক্কলনে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০ হাজার ১০০ কোটি টাকায়।
সংশ্লিষ্ট বিভাগ পরিকল্পনা কমিশনকে জানিয়েছে, বৈশ্বিক ও দেশীয় বাজারে মূল্যস্ফীতি এবং নানা বাস্তব প্রেক্ষাপটের কারণে প্রাক্কলিত ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই পরিচালনাকারী জাপানি সংস্থার প্রাথমিক সমীক্ষার ভিত্তিতেই মূল বাজেট তৈরি হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে জাপানি পরামর্শকরা নিজেদের প্রাক্কলন সংশোধন করে ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়ায় ঠিকাদাররাও বেশি দর হাঁকাতে শুরু করে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ও ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও তাঁরা কোনো সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানাননি। তবে পরিকল্পনা কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিস্তারিত নকশায় প্রকল্পের প্রকৃত চাহিদা ও ব্যয় সঠিকভাবে প্রতিফলিত না হওয়ায় এই বৃদ্ধি ঘটেছে।
সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ, জাপানি অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোতে সাধারণত পরামর্শক নিয়োগের শর্ত থাকে জাপান থেকেই, আর সেই পরামর্শক সংস্থাগুলো পরবর্তীতে দরপত্রের শর্ত এমনভাবে সাজায় যাতে কার্যত জাপানি ঠিকাদাররাই অংশ নিতে পারে। কাগজে-কলমে দরপত্র উন্মুক্ত থাকলেও বাস্তবে একই কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বারবার শীর্ষ দরদাতা হিসেবে উঠে আসে, যা প্রক্রিয়াটিকে কার্যত সীমিত প্রতিযোগিতায় পরিণত করে এবং নতুন বা বিকল্প যোগ্য ঠিকাদারদের অংশগ্রহণের সুযোগ সংকুচিত করে।
উল্লেখযোগ্য, ৩১ দশমিক ২৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এর একটি অংশ—বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার—সম্পূর্ণ পাতাল পথে নির্মিত হচ্ছে ১২টি ভূগর্ভস্থ স্টেশনসহ, যা বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল চালুর পথ তৈরি করবে। অন্যদিকে নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১১ কিলোমিটার অংশ আংশিক উড়াল ও আংশিক পাতাল পথে নির্মিত হচ্ছে।
জাপানি ঠিকাদারদের চড়া দরপ্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বেশ কয়েকটি প্যাকেজের দরপত্র প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছিল। ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, ডিএমটিসিএল ও সড়ক পরিবহন বিভাগ জাপানের সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে একাধিক দফা বৈঠক করেছে, এমনকি একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল জাপান সফরও করেছে। বর্তমান সরকারের সময়েও এই আলোচনা অব্যাহত থাকার মধ্যেই নতুন সংশোধিত প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
প্রকল্পের ১২টি প্যাকেজের মধ্যে ডিপো এলাকার ভূমি উন্নয়নসংক্রান্ত একটি প্যাকেজের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে, বাকি ১১টির ক্রয় প্রক্রিয়া বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি সুপারিশও উঠে এসেছে—যেমন জাপানি অর্থায়নের প্রকল্পে বিশেষ শর্ত শিথিল করা, কর অব্যাহতি সুবিধা সব ঠিকাদারের জন্য উন্মুক্ত করা এবং প্রাক-যোগ্যতা যাচাইয়ের একটি ভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করে বেশি সংখ্যক যোগ্য ঠিকাদারকে সুযোগ দেওয়া।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একজন অধ্যাপকের মতে, এত বড় অঙ্কের ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে জাতীয় সংসদসহ জনসাধারণের প্ল্যাটফর্মে খোলামেলা আলোচনা হওয়া জরুরি। তাঁর ভাষ্যে, প্রতিযোগিতাহীনভাবে নির্ধারিত ব্যয় ভবিষ্যতে বড় প্রশ্নের জন্ম দেবে, আর তখন তার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বর্তমান ব্যয় নির্ধারণ আদৌ প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের ফল কিনা এবং তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা। তাঁর মতে, এত বড় বিনিয়োগের আগে ব্যয় নির্ধারণ, প্রকল্পের কার্যকারিতা এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক দায় সতর্কভাবে বিশ্লেষণ করা এবং জনগণের অর্থে পরিচালিত এই প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রাথমিক সমীক্ষা ও নকশা প্রণয়নকারী পরামর্শক সংস্থার মাধ্যমেই যদি পরবর্তীতে ব্যয় বৃদ্ধি পায়, তাহলে তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাম্প্রতিক মেট্রোরেল দরপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ভারতের পাটনায় প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় হয় প্রায় ৪১ মিলিয়ন ডলার, সৌদি আরবের রিয়াদে প্রায় ১৬৬ মিলিয়ন ডলার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে প্রায় ১৮৮ মিলিয়ন ডলার। সেখানে ঢাকায় এই ব্যয় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ২২৭ থেকে ২৫৪ মিলিয়ন ডলারে, যা পাটনার তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ এবং রিয়াদ বা দুবাইয়ের চেয়েও উল্লেখযোগ্য বেশি।

