স্বচ্ছল না হোক, সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার একটি ছক থাকে মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনে—কর্মস্থলের কাছাকাছি একটা ছোট ভাড়া বাসা, একটা এসি, হয়তো একটা মোটরসাইকেল, ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে বাইরে খাওয়া, আর মাস শেষে সামান্য কিছু সঞ্চয়। এটা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং কারও কাছে হাত না পেতে টিকে থাকার একটা লড়াই। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় এখন সেই চেনা ছককেই নাড়িয়ে দিচ্ছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের এক বাসিন্দার অভিজ্ঞতাই ধরা যাক। গত আগস্টে বিদ্যুৎ বিল হাতে পেয়ে তিনি ভেবেছিলেন খরচ কম আসবে, কারণ প্রচণ্ড গরমের পর জুলাইয়ে আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা থাকায় ঘরের একমাত্র এসিটি প্রায় চালানোই হয়নি। কিন্তু বিল দেখে তিনি বিস্মিত—দুই বেডরুমের ছোট ফ্ল্যাটের যে বিল দুই হাজার টাকার নিচে থাকার কথা ছিল, তা তিন হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে। তার ভাষায়, বিদ্যুতের বাড়তি দাম ছাড়া এর আর কোনো ব্যাখ্যা তার কাছে নেই।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এই দুর্ভোগের নাম ‘জেদি মূল্যস্ফীতি’—যা সরকারের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও কয়েক বছর ধরে মানুষের স্বস্তিদায়ক সীমার অনেক ওপরে অবস্থান করছে। এই চাপ সমাজের প্রতিটি স্তরে দৃশ্যমান—ভর্তুকি মূল্যের পণ্যের লাইনে ভিড় বাড়ছে, লাখো মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে, আর একসময় সামান্য সঞ্চয় করতে পারা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর সেই জমানো টাকাও এখন নিত্যদিনের খরচেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
মধ্যবিত্তের এই সংকট বিশেষভাবে তীব্র, কারণ তাদের আয় সরকারি সহায়তা পাওয়ার মতো কম নয়, আবার মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলানোর মতো যথেষ্টও নয়। ধনীর প্রশ্ন যেখানে ‘আমি কি এটা কিনতে পারব’, মধ্যবিত্তের প্রশ্ন সেখানে ‘সঞ্চয়ে হাত না দিয়ে আমি কীভাবে এটা কিনব’।
গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সরকার জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বাড়ায়, যার প্রভাব সরাসরি এসে পড়ে মধ্যবিত্তের ওপর—বাড়তি বিদ্যুৎ বিল, যাতায়াত খরচ, আর পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবে খাবারের দামও বেড়ে যায়। অর্থনীতিবিদরা আগেই এই ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। গত জুনে একটি নীতি-গবেষণা প্রতিষ্ঠান সতর্ক করেছিল, বিদ্যুতের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে—আর সেই আশঙ্কাই এখন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রান্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিই সার্বিক মূল্যস্ফীতিকে সাড়ে নয় শতাংশের কাছাকাছি ঠেলে দিয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লাইনের গ্যাসের তীব্র সংকট। শহরের বহু বাসাবাড়িতেই রান্নার জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস মিলছে না, ফলে বাধ্য হয়ে অনেকে বৈদ্যুতিক চুলা বা এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছেন, যা বেশ ব্যয়বহুল। ঘন ঘন লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। রাজধানীর পল্লবী এলাকার এক বাসিন্দা জানান, ছুটির দিনে রান্না করাই প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন রাইস কুকার বা এয়ার ফ্রায়ারের মতো বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ওপরই ভরসা করতে হয়। ইনডাকশন কুকার কেনার পরিকল্পনা করেও বিদ্যুৎ বিল বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় পিছিয়ে এসেছেন তিনি। ফরিদপুরের এক বাসিন্দা জানান, এলপিজি সিলিন্ডারের খরচ এতটাই বেড়েছে যে তা মেটাতে অন্যান্য খাতের খরচ কমাতে হচ্ছে তাকে।
শুধু জ্বালানি বিল নয়, এই চাপ পৌঁছে গেছে বাজারের থলে থেকে ডাইনিং টেবিল পর্যন্ত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব বলছে, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ক্রমাগত বেড়েছে—গত ডিসেম্বরে যা ছিল প্রায় সাড়ে সাত শতাংশ, মার্চে বেড়ে দাঁড়ায় সোয়া আট শতাংশে, আর জুনে তা আরও বেড়ে প্রায় সাড়ে আট শতাংশে পৌঁছায়। মূলত মাংস, মাছ, ফল, সবজি ও মসলার দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যে খুচরা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের দামও বাড়ানো হয়েছে। মোটরসাইকেলে যাতায়াতকারী ঢাকার বসিলা এলাকার এক বাসিন্দা জানান, অকটেনের দাম বেশ কিছুটা বাড়ায় তার মাসিক বাজেটে বড় ধাক্কা লেগেছে। সম্প্রতি বেতন কিছুটা বাড়ায় তিনি কোনোমতে সামলাতে পারছেন, তবে সামগ্রিকভাবে সাধারণ মানুষের আয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না বলে মনে করছেন তিনি। একজন গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রধান সম্প্রতি মন্তব্য করেছিলেন, মানুষের আয় বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে পিছিয়ে থাকায় ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত কমছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে আয় বৃদ্ধির হার ছিল সোয়া আট শতাংশ, যেখানে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল তার চেয়ে বেশি।
দীর্ঘমেয়াদি এই মূল্যবৃদ্ধি এখন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা ও সঞ্চয়ের সক্ষমতা ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। একটি অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থার নির্বাহী পরিচালক বলেন, তিন বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, ইউটিলিটি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার খরচ বারবার বাড়ায় মানুষের প্রকৃত আয় ধারাবাহিকভাবে কমেছে। তার ভাষায়, যাদের আয় কাগজে-কলমে বেড়েছে, তারাও বাস্তবে আরও দরিদ্র হয়ে পড়েছেন, কারণ জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আয় বাড়েনি।
মোহাম্মদপুরের ওই বাসিন্দার পরিবারে চারজনের সংসার চালান একজনই, খুব হিসাব করে চলতে হয় তাদের। কিছুদিন আগেও তিনি প্রতি মাসে সামান্য কিছু টাকা সঞ্চয় করতে পারতেন, কিন্তু গত ছয় মাসে জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকায় সেই সুযোগ পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। তার ভাষায়, এখন শুধু বেঁচে থাকাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে, সঞ্চয়ের কথা তো দূরের বিষয়।
গবেষণা সংস্থার ওই নির্বাহী পরিচালক বলেন, এই পরিবারগুলোর হাতে এখনো কোনো সঞ্চয় আছে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর দিন দিন নেতিবাচক হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই জমানো টাকা তুলে ফেলছেন, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমাচ্ছেন, সস্তা পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন, এমনকি স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পেছনের খরচও কমিয়ে দিচ্ছেন। তিনি মনে করেন, মধ্যবিত্তরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে, কারণ একদিকে তারা সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাইরে, অন্যদিকে আবাসন, শিক্ষা ও পারিবারিক খরচের বিশাল বোঝা তাদের একাই বহন করতে হয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই অর্থনৈতিক চাপ মানুষের সামাজিক অবস্থানকে স্থায়ীভাবে নিচে নামিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
দেশের এই মূল্যস্ফীতি এখন আর কেবল বৈশ্বিক বাজারের প্রভাব নয়, বরং এটি অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকেও সামনে এনেছে। একটি নীতি-গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক গবেষণা কর্মকর্তা বলেন, এই সংকটের দীর্ঘস্থায়িত্বই একে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে, কারণ দরিদ্র পরিবারগুলোর বাজেটের সিংহভাগ চলে যায় খাবারের পেছনে, আর প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় খরচ কমানোর আর কোনো সুযোগ তাদের হাতে অবশিষ্ট নেই।
একটি ভোক্তা অধিকার সংগঠনের সভাপতি বলেন, মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, বিশেষত খাদ্যের দামের মধ্য দিয়ে আঘাত হেনেছে। এর প্রভাব শুধু পারিবারিক বাজেটেই সীমাবদ্ধ নয়—উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়ায় বেসরকারি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে, কারখানাগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে, আর নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পথও সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
গবেষণা সংস্থার ওই নির্বাহী পরিচালকের মতে, প্রচলিত মুদ্রানীতি বা অর্থের জোগান কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এই সংকট সমাধানে খুব একটা কার্যকর হবে না, কারণ এই সংকট মূলত পণ্য সরবরাহের প্রতিবন্ধকতা, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং বিতরণ কাঠামোর ত্রুটি থেকে সৃষ্ট। তিনি সতর্ক করে বলেন, বাজারে সরবরাহ কম থাকাই এই মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ—এই অবস্থায় মানুষের কেনাকাটা বা চাহিদা কমানোর চেষ্টা উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে, কারণ তাতে মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত কারণের কোনো সমাধান হবে না, বরং অর্থনীতির আরও ক্ষতি হতে পারে।

