খেলাপি ঋণ আদায়ে বেক্সিমকো লিমিটেডের বন্ধক রাখা জমি ও সম্পত্তি নিলামে তুলছে রূপালী ব্যাংক। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে থাকা প্রায় ২৬ একর সম্পত্তি নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব সম্পত্তির বিপরীতে ব্যাংকের পাওনা প্রায় ১৯১ কোটি টাকা।
তবে রূপালী ব্যাংকে বেক্সিমকো গ্রুপের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেশি—প্রায় ৪৮৩ কোটি টাকা। শুধু রূপালী ব্যাংক নয়, দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বেক্সিমকো গ্রুপের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
রূপালী ব্যাংকের পক্ষ থেকে শুক্রবার নিলামের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। এতে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় থাকা বন্ধকী সম্পত্তির বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
পাওনা ১৯১ কোটি, নিলামে প্রায় ২৬ একর জমি
ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বেক্সিমকো টেক্সটাইলের কাছে রূপালী ব্যাংকের সর্বশেষ পাওনা ১৯০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর মধ্যে অনাদায়ী সুদ অন্তর্ভুক্ত নয়।
ব্যাংকের মূল পাওনা, অন্যান্য খরচ এবং আদালতের সুদসহ অর্থ আদায়ের জন্য বন্ধক রাখা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বর্তমান অবস্থায় নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঋণগ্রহীতা হিসেবে বিজ্ঞপ্তিতে সর্বশেষ নাম উল্লেখ করা হয়েছে বেক্সিমকো লিমিটেড।
নিলামের তালিকায় নারায়ণগঞ্জের তারাব ও যাত্রামুরা মৌজার জমিও রয়েছে। তারাব মৌজার দুটি অংশে রয়েছে ৮ দশমিক ৩৯ একর জমি। এর একটি অংশে ৪ দশমিক ৫২ একর এবং অন্য অংশে ৩ দশমিক ৮৭ একর জমি রয়েছে।
যাত্রামুরা মৌজায় আরও ৯ দশমিক ২ একর জমি রাখা হয়েছে নিলামের তালিকায়। অর্থাৎ নারায়ণগঞ্জের এই তিনটি তফসিলেই মোট জমির পরিমাণ ১৭ দশমিক ৪১ একর।
অন্যদিকে গাজীপুরে রয়েছে ৮ দশমিক ৫৫ একর জমি। সব মিলিয়ে তালিকাভুক্ত জমির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৫ দশমিক ৯৬ একর।
গাজীপুরের জয়দেবপুর, কালিয়াকৈর, কাপাসিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার আরও কয়েকটি জমিও নিলামের আওতায় রয়েছে। কোথাও জমির পরিমাণ একরে, আবার কোথাও শতাংশে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৪ সেপ্টেম্বর জমা দিতে হবে দরপত্র
নিলামে অংশ নিতে আগ্রহী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টার মধ্যে নির্ধারিত কার্যালয়ে দরপত্র জমা দিতে হবে। সেদিন দুপুর ২টা ৫ মিনিটে অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতিতে দরপত্র খোলা হবে।
দরপত্রের সঙ্গে প্রস্তাবিত মূল্যের নির্দিষ্ট অংশ জামানত হিসেবে জমা দিতে হবে। ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দর হলে জামানতের হার ২০ শতাংশ। ১০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে ১৫ শতাংশ এবং ৫০ লাখ টাকার বেশি হলে জামানত দিতে হবে ১০ শতাংশ।
তবে সম্পত্তির প্রস্তাবিত মূল্য অস্বাভাবিকভাবে কম বা অপর্যাপ্ত মনে হলে কর্তৃপক্ষ দরপত্র বাতিল করার অধিকার রাখবে।
বেক্সিমকোর মোট ঋণ ৬ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা
২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বেক্সিমকো লিমিটেডের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ঋণ ৩ হাজার ১০৯ কোটি টাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ৩ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা।
রূপালী ব্যাংকে কোম্পানিটির ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৮২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে বর্তমান নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে ১৯০ কোটি ৯২ লাখ টাকা পাওনার কথা বলা হয়েছে।
ঋণগুলো মূলত বেক্সিমকোর দুটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান পদ্মা ও বেক্সিমকো নিটিংয়ের নামে নেওয়া হয়েছিল। পরে প্রতিষ্ঠান দুটি একীভূত হয়ে বেক্সিমকো টেক্সটাইল এবং পরবর্তী সময়ে বেক্সিমকো লিমিটেডের সঙ্গে একীভূত হয়।
কোম্পানি বন্ধ থাকলে ঋণ পরিশোধ কীভাবে হবে—বেক্সিমকো
রূপালী ব্যাংকের নিলামের বিষয়ে বেক্সিমকো লিমিটেডের কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ আসাদ উল্লাহ বলেন, তিনি এ নিলামের বিষয়ে অবগত নন।
তার দাবি, ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বেক্সিমকো কোনো ঋণখেলাপি ছিল না। এরপর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যবসা থেকে আয় করার সুযোগও নেই।
তিনি বলেন, কোম্পানি বন্ধ থাকলে ঋণ পরিশোধের অর্থ আসবে কোথা থেকে—এটাই বড় প্রশ্ন। প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন উৎপাদনের বদলে পড়ে আছে যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য অবকাঠামো। এতে বহু শ্রমিকও বেকার হয়ে পড়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদের মতে, ঋণ পরিশোধ না হলে বন্ধক রাখা সম্পত্তি নিলামে তোলা ব্যাংকের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে এ ধরনের বড় সম্পত্তির নিলামে সাধারণত পর্যাপ্ত ক্রেতা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেক সময় নিলাম কার্যত আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।
আগেও বিক্রির উদ্যোগ, হয়নি বাস্তবায়ন
বেক্সিমকোর সম্পত্তি বিক্রির উদ্যোগ এর আগেও নেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর বেক্সিমকো টেক্সটাইল বিক্রির উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
সে সময় জাপানভিত্তিক প্রবাসীদের প্রতিষ্ঠান রিভাইভাল গ্রুপ এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রবাসীদের প্রতিষ্ঠান ইকোনোমিল্লি আগ্রহ প্রকাশ করে। তারা ২ কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৫০ কোটি টাকা, বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।
বেক্সিমকো টেক্সটাইলের নামে জনতা ব্যাংকে ৮৬০ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে, যার পুরোটা খেলাপি। শুধু জনতা ব্যাংকেই বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
এর আগে ২০১৬ সালের ১২ জুলাই জিএমজি এয়ারলাইন্সের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে সালমান এফ রহমানের ধানমন্ডির বাড়ি নিলামে তুলেছিল সোনালী ব্যাংক। তখন ব্যাংকটির পাওনা ছিল ২২৮ কোটি টাকা। তবে সেই নিলামেও শেষ পর্যন্ত ক্রেতা পাওয়া যায়নি।
বড় অঙ্কের ঋণ ও আর্থিক বিতর্ক
বেক্সিমকো গ্রুপের মালিক সালমান এফ রহমান দেশের অন্যতম আলোচিত ব্যবসায়ী। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন।
গত বছরের মার্চ পর্যন্ত তার ২৮টি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে তিন বছরে বেক্সিমকোসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে দৃশ্যমানভাবে ৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা সংগ্রহের তথ্যও রয়েছে। এর মধ্যে বেক্সিমকো সুকুক বন্ড থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা, আইএফআইসি আমার বন্ড থেকে ১ হাজার কোটি টাকা এবং বেক্সিমকো জিরো কুপন বন্ড থেকে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা নেওয়া হয়।
বেক্সিমকোর শেয়ারে কারসাজির অভিযোগে গত বছরের ১ অক্টোবর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪২৮ কোটি টাকা জরিমানা করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন।
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনা বিদেশে চলে যান। এরপর সালমান এফ রহমান বাংলাদেশেই ছিলেন এবং সরকার পতনের কয়েক দিনের মধ্যে ঢাকার নারায়ণগঞ্জ থেকে কোস্ট গার্ডের হাতে গ্রেপ্তার হন। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
সব মিলিয়ে রূপালী ব্যাংকের এই নিলাম শুধু একটি ঋণ আদায়ের পদক্ষেপ নয়; বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।

