দীর্ঘ সময়ের স্থবিরতার পর দেশের নির্মাণ খাতে আবারও কিছুটা গতি ফিরতে শুরু করেছে। সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পের কার্যক্রম বাড়া, আবাসন খাতে নতুন চাহিদা তৈরি হওয়া এবং বাণিজ্যিক ও শিল্প স্থাপনায় আগ্রহ বৃদ্ধির কারণে এ খাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।
তবে নির্মাণ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পুনরুদ্ধার এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। উচ্চ ঋণের খরচ, নির্মাণসামগ্রীর বাড়তি দাম, জ্বালানি সংকট এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি খাতটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্মাণ খাতের স্থায়ী উন্নতির জন্য প্রয়োজন একটি স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশ, সুদের হার নিয়ন্ত্রণে আনা এবং নির্মাণসামগ্রীর দামের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নির্মাণ খাতের গুরুত্ব অনেক বেশি। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে এই খাতের অবদান প্রায় ১৫ শতাংশ। পাশাপাশি প্রায় ৫০ লাখ মানুষ সরাসরি এই খাতের সঙ্গে যুক্ত এবং ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিক, পরিবহনসহ ৩০০টির বেশি সহায়ক শিল্প নির্মাণ খাতের ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত সাম্প্রতিক শিল্প প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নির্মাণ খাতের নামমাত্র মোট দেশজ উৎপাদনে অবদান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৪ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা থেকে প্রায় ৫ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ব্যবসায়িক পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকেও নির্মাণ খাতের উন্নতির চিত্র উঠে এসেছে। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই), ঢাকা এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের প্রকাশিত আগস্ট মাসের ক্রয় ব্যবস্থাপনা সূচকে দেখা গেছে, উৎপাদন ও সেবা খাতের পাশাপাশি নির্মাণ খাতও আবার সম্প্রসারণের পর্যায়ে ফিরেছে।
আগস্ট মাসে নির্মাণ খাতের সূচক ৫২ দশমিক ৪ পয়েন্টে পৌঁছায়। এতে বোঝা যায়, খাতটির কার্যক্রম ও কর্মসংস্থানে নতুন গতি তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবসায়িক খরচ কমে আসা, অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি এবং তুলনামূলক সহায়ক নীতিগত পরিবেশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহের উন্নতি, সহজ অর্থায়ন ব্যবস্থা, পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ করা গেলে নির্মাণ খাতে আস্থা আরও বাড়তে পারে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, আগস্ট মাসের সামগ্রিক ব্যবসায়িক সূচক ৪৯ দশমিক ৯ থাকলেও অর্থনৈতিক কার্যক্রম মোটামুটি স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। তিনি বলেন, কৃষি খাতের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি এবং নির্মাণ খাতের পুনরায় সম্প্রসারণ দেশের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নির্মাণসামগ্রীর বাজারেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা চাহিদা বেড়েছে। শাহজাদপুরের এম/এস আবুল কাশেম ট্রেডিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপক নিয়ামুল সাদেক জানান, আবাসন খাতে কিছুটা গতি ফেরায় নির্মাণসামগ্রীর বিক্রি আগের তুলনায় বেড়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে বিএসআরএমের উন্নতমানের রড প্রতি টন ৯২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া একেএস ও জিপিএইচ ইস্পাতের রডের দাম প্রতি টন ৯০ হাজার টাকা এবং সালাম স্টিলের রডের দাম ৮৭ হাজার টাকা। রাজধানীতে ৫০ কেজির এক বস্তা সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৫৬০ টাকার মধ্যে।
তার মতে, চাহিদা বাড়ার কারণে রডের দাম প্রতি টনে প্রায় ৫ হাজার টাকা এবং সিমেন্টের দাম প্রতি বস্তায় ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। সরকারি প্রকল্প এবং ব্যক্তিগত আবাসন কার্যক্রম বাড়ায় ভবিষ্যতে নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা আরও বাড়তে পারে।
তবে নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো ব্যয় বৃদ্ধির চাপের মধ্যে রয়েছে। বিএসআরএম লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের উচ্চ মূল্য উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি বলেন, কাঁচামালের উচ্চ মূল্য নির্মাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করছে। এ সমস্যা সমাধানে নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
রিয়েল এস্টেট খাতেও কিছুটা পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। রূপায়ণ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রতুল প্রপার্টিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মুজাম্মেল হক আকন্দ জানান, সম্প্রতি বাণিজ্যিক সম্পত্তি, বিশেষ করে অফিস ও দোকানের চাহিদা কিছুটা বেড়েছে।
তিনি বলেন, ১ কোটি থেকে দেড় কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তিতে কিছুটা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি ২ কোটি থেকে ৪ কোটি টাকা মূল্যের উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির সম্পত্তির বাজারও তুলনামূলক সক্রিয় রয়েছে।
তবে তিনি জানান, বর্তমানে অনেক বিনিয়োগকারী প্রস্তুত সম্পত্তির তুলনায় জমি উন্নয়ন প্রকল্পে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তাদের কাছে জমিতে বিনিয়োগ তুলনামূলক নিরাপদ মনে হচ্ছে।
তার মতে, ২০২৪ সালের আগের সময়ের তুলনায় ক্রেতাদের আগ্রহ এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি। নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধির কারণে বাড়ছে সম্পত্তির মূল্য, অন্যদিকে বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়েও অনেক ক্রেতার মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি খরচও আবাসন খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বড় ব্যবসায়ীদের অনেকেই আগের মতো বিনিয়োগ করছেন না। যারা বিনিয়োগ করছেন, তারা অনেক ক্ষেত্রে বাজারমূল্যের চেয়ে ১০ থেকে ২০ শতাংশ কম দামে সম্পত্তি কিনতে আগ্রহী।
এর ফলে ক্রেতা ও বিক্রেতার প্রত্যাশার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। বিক্রেতারা সহজে দাম কমাতে চাইছেন না, আবার ক্রেতারা ছাড়ের প্রত্যাশা করছেন। এতে পুরোনো সম্পত্তির বাজারে লেনদেন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
আনোয়ার সিমেন্ট লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফুরকান এন হোসেন বলেন, নির্মাণ শিল্প দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে বর্তমান কর কাঠামো উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
তিনি বলেন, সরকারের রাজস্ব আয় মূলত চাহিদার ওপর নির্ভর করে। বর্তমানে সিমেন্ট শিল্প ৫০ শতাংশেরও কম সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। বাজেটের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে এই শিল্পকে প্রায় ৮৫ শতাংশ সক্ষমতায় পৌঁছাতে হবে। এর জন্য নির্মাণ কার্যক্রম বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন।
গ্লোরিয়াস ল্যান্ডস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ড. আলী আফজাল বলেন, নির্মাণ ও আবাসন খাতে কার্যক্রম কিছুটা বাড়লেও এখনো বেশ কিছু সমস্যা রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে সরকারি জমি, নীতিগত সহায়তা এবং বেসরকারি খাতের দক্ষতা একসঙ্গে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
তিনি ভবন নির্মাণ অনুমোদন, জমি নিবন্ধন এবং অ্যাপার্টমেন্ট নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল করার আহ্বান জানান। তার মতে, ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলে সরকারি সেবা দ্রুত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে এবং নির্মাণ খাতের অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে নির্মাণ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই গতি ধরে রাখতে হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ নির্মাণ শিল্প শুধু একটি খাত নয়, বরং দেশের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি।

