দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করল পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ইসলামী ব্যাংক। এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অধীনে। পাঁচ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নেওয়ার পর রোববার থেকে নতুন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক হিসেবে সম্মিলিতভাবে কার্যক্রম শুরুর পথে এগিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে এই একীভূতকরণকে শুধু পাঁচটি ব্যাংককে একটি প্রতিষ্ঠানের ছাতার নিচে আনার ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। নতুন ব্যাংকের সামনে যেমন রয়েছে বড় শাখা ও সেবাকাঠামো, তেমনি রয়েছে বিপুল খেলাপি ঋণ, দুর্বল আর্থিক ভিত্তি এবং পাঁচটি আলাদা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি কাঠামো এক করার কঠিন কাজ। ফলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু একীভূতকরণ শেষ হওয়ার ওপর নয়, বরং পুরোনো আর্থিক ক্ষত কতটা কার্যকরভাবে সামাল দেওয়া যায় তার ওপর।
পাঁচ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ এখন এক প্রতিষ্ঠানের হাতে
শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংক গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে প্রশাসক প্রত্যাহার করে নেয়। একই সঙ্গে এই দুই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে পাঁচটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণই নতুন ব্যাংকের অধীনে চলে আসে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, পাঁচটি ব্যাংকেরই নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর সম্পন্ন হয়েছে। ফলে রোববার থেকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক একটি একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করতে পারবে।
এর আগে গত ৩০ জুলাই এক্সিম ব্যাংক থেকেও প্রশাসক প্রত্যাহার করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তার এক দিন আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ওই ব্যাংক থেকে প্রশাসক ও তাঁর দলের সদস্যদের সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
পাঁচ ব্যাংককে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অধীনে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল গত ২০ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায়। এরপর ধাপে ধাপে পাঁচটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নতুন প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আবেদুর রহমান সিকদারকে নিয়োগ দেওয়া হয় ১৬ জুলাই। নতুন প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্ব এখন তাঁর ওপরই বর্তাবে।
একীভূত ব্যাংকের পরিসর বড়
পাঁচটি ব্যাংক এক হওয়ায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক শুরুতেই দেশের বিস্তৃত একটি ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক পাচ্ছে। নতুন ব্যাংকের অধীনে রয়েছে ৭৬০টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫১১টি এজেন্ট ব্যাংকিং কেন্দ্র এবং ৯৭৫টি এটিএম।
এই বিশাল নেটওয়ার্ক নতুন ব্যাংকের জন্য একদিকে বড় সম্পদ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা গ্রাহকদের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। একই সঙ্গে এত বড় নেটওয়ার্ক পরিচালনা করাও হবে বড় ধরনের ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জ।
পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের আলাদা শাখা কাঠামো, কর্মী ব্যবস্থাপনা, হিসাব পদ্ধতি, গ্রাহকসেবা ও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা এক ছাতার নিচে আনা সহজ কাজ নয়। একীভূত হওয়ার পর একই ধরনের কার্যক্রমের পুনরাবৃত্তি থাকলে খরচ কমানো, কর্মী কাঠামো পুনর্বিন্যাস এবং সেবার মান এক পর্যায়ে নিয়ে আসার প্রয়োজন হতে পারে।
অর্থাৎ পাঁচটি ব্যাংককে কাগজে-কলমে এক করা এবং বাস্তবে একটি শক্তিশালী ব্যাংক হিসেবে গড়ে তোলা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
সবচেয়ে বড় বোঝা খেলাপি ঋণ
নতুন ব্যাংকের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা নিঃসন্দেহে খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে পাঁচটি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা। পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছিল ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যানই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সামনে থাকা সংকটের গভীরতা স্পষ্ট করে। একটি ব্যাংকের মোট ঋণের বড় অংশ যদি খেলাপি হয়ে যায়, তাহলে শুধু নতুন করে ঋণ দেওয়া কমিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না। ঋণ আদায়, সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ, ক্ষতির হিসাব স্বচ্ছভাবে প্রকাশ এবং যেসব ঋণ আদায়যোগ্য সেগুলো দ্রুত পুনরুদ্ধার করা জরুরি হয়ে পড়ে।
পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণের ফলে এখন এই বিশাল খেলাপি ঋণের দায়ও নতুন প্রতিষ্ঠানের ব্যালান্সশিটে এসে পড়েছে। তাই নতুন ব্যাংকের জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা হবে কীভাবে এই ঋণ পুনরুদ্ধার করা যায় এবং একই সঙ্গে নতুন করে খেলাপি ঋণ তৈরির প্রবণতা বন্ধ করা যায়।
সরকারের ২০ হাজার কোটি টাকার সহায়তা
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে সরকার নতুন ব্যাংকটিকে ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন সহায়তা দিয়েছে।
এই অর্থ নতুন ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এত বিপুল খেলাপি ঋণের বিপরীতে শুধু মূলধন জোগান দিলেই ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা পুরোপুরি ফিরে আসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
কারণ মূলধন সহায়তা ব্যাংকের তাৎক্ষণিক চাপ সামলাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি ব্যাংককে টেকসই করতে হলে ঋণ আদায় বাড়াতে হবে, নতুন ঋণ বিতরণে কঠোর যাচাই নিশ্চিত করতে হবে এবং ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
এ কারণে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য সরকারি মূলধন সহায়তা অনেকটা শুরুর শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু প্রকৃত পুনরুদ্ধারের কাজ হবে ঋণ ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের ক্ষেত্রে।
কীভাবে শুরু হয়েছিল এই একীভূতকরণ
পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করার প্রক্রিয়া শুরু হয় গত বছরের নভেম্বর মাসে। সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার মূল্যহীন ঘোষণা করেন। একই দিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পাঁচটি ব্যাংক পরিচালনার জন্য প্রশাসক ও তাঁদের দল নিয়োগ করে।
এরপর ডিসেম্বর মাসে সরকার সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে অনুমোদন দেয়।
প্রায় নয় মাস ধরে বিভিন্ন ধাপে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া চলার পর অবশেষে পাঁচটি ব্যাংকের প্রশাসকদের প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়েছে। এখন এসব ব্যাংক কার্যত নতুন প্রতিষ্ঠানের অধীনে চলে এসেছে।
এই প্রক্রিয়ার পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক দুর্বলতায় থাকা ব্যাংকগুলোকে আলাদা আলাদাভাবে টিকিয়ে রাখার পরিবর্তে একটি বড় কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসা। তবে একীভূতকরণের মাধ্যমে সমস্যাগুলো এক জায়গায় চলে এলেও সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে দূর হবে না।
সামনে সবচেয়ে কঠিন কাজ প্রযুক্তি ব্যবস্থা এক করা
প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর শেষ হলেও পাঁচ ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ একীভূতকরণ এখনো শেষ হয়নি। সবচেয়ে বড় কাজগুলোর একটি হলো পাঁচটি ব্যাংকের পৃথক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা একত্র করা।
বর্তমানে পাঁচটি ব্যাংক তাদের নিজস্ব নামে ব্যাংকিং সেবা চালিয়ে যাবে। যদিও নিয়ন্ত্রণ থাকবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের হাতে। পরে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা একীভূত হলে পাঁচটি ব্যাংকের কার্যক্রম পুরোপুরি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের একক পরিচয়ের অধীনে চলে আসবে।
এই কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যাংকের হিসাব, গ্রাহকের তথ্য, আমানত, ঋণ, লেনদেন, শাখা কার্যক্রম এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা—সবকিছু একটি অভিন্ন ব্যবস্থায় নিয়ে আসতে হবে।
একই সঙ্গে গ্রাহকের সেবা যাতে ব্যাহত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। পাঁচটি ব্যাংকের কয়েক হাজার শাখা ও সেবাকেন্দ্রের কার্যক্রম এক করার সময় সামান্য সমন্বয়হীনতাও গ্রাহকদের জন্য ভোগান্তি তৈরি করতে পারে।
শুধু নাম বদলালেই বদলাবে না ব্যাংকের চিত্র
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সামনে তাই মূল প্রশ্ন হলো—একীভূতকরণের পর ব্যাংকটি কীভাবে পুরোনো দুর্বলতা কাটিয়ে উঠবে।
পাঁচটি ব্যাংকের ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশ খেলাপি ঋণের হার দেখিয়ে দেয় যে সমস্যাটি কেবল ব্যবস্থাপনা কাঠামোর নয়, বরং দীর্ঘদিনের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক শৃঙ্খলার সঙ্গেও যুক্ত। ফলে নতুন ব্যাংককে শুরু থেকেই ঋণ আদায়ে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
একই সঙ্গে ভালো গ্রাহক ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির মধ্যে পার্থক্য করাও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়িক কারণে সাময়িক সমস্যায় পড়া কোনো প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করা, সম্পদ গোপন করা বা ব্যাংকের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা না নিলে নতুন ব্যাংকের ওপরও পুরোনো সংস্কৃতির প্রভাব পড়তে পারে।
এখানেই একীভূতকরণের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে।
নতুন ব্যাংকের সামনে সুযোগও কম নয়
তবে পরিস্থিতির পুরোটা নেতিবাচক নয়। ৭৬০টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫১১টি এজেন্ট ব্যাংকিং কেন্দ্র এবং ৯৭৫টি এটিএম নিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক দেশের অন্যতম বড় ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
সঠিক ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর সংস্কার করা গেলে এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ভবিষ্যতে বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে। বিশাল গ্রাহকভিত্তি, ব্যাপক শাখা কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় সহায়তার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যাংকটি ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।
কিন্তু এর জন্য প্রথমেই প্রয়োজন আস্থার পুনর্গঠন। আমানতকারীরা যেন তাঁদের অর্থ নিয়ে নিরাপদ বোধ করেন, ব্যবসায়ীরা যেন ব্যাংকটির ঋণ ব্যবস্থাপনায় আস্থা রাখতে পারেন এবং ব্যাংকের ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ যেন পেশাদার ও স্বচ্ছ হয়—এই তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের যাত্রা তাই শুধু পাঁচটি ব্যাংকের প্রশাসনিক একীভূতকরণ নয়। এটি দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের জমে থাকা দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার একটি বড় পরীক্ষা। ১ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ এবং ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশ খেলাপি ঋণের হার নিয়ে শুরু করা এই ব্যাংককে প্রমাণ করতে হবে, বড় আকার সবসময় শক্তির প্রতীক নয়; সুশাসন, ঋণ আদায়, আর্থিক শৃঙ্খলা ও আমানতকারীর আস্থাই একটি ব্যাংকের প্রকৃত ভিত্তি।
এখন দেখার বিষয়, ২০ হাজার কোটি টাকার সরকারি মূলধন সহায়তা এবং বিশাল ব্যাংকিং নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কত দ্রুত পুরোনো ক্ষত সারাতে পারে। একীভূতকরণের প্রশাসনিক অধ্যায় শেষ হলেও প্রকৃত পরীক্ষা এখনই শুরু।

