যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল পুরো সক্ষমতায় পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর কার্যক্রম চালানোর প্রস্তুতি নেওয়ায় দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বস্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই স্বস্তি পুরোপুরি আসার আগেই সামনে এসেছে নতুন সংকট। টার্মিনাল চালানোর সক্ষমতা ফিরলেও প্রয়োজনীয় এলএনজি কার্গো সময়মতো জোগাড় করা এখন পেট্রোবাংলার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোববার এক্সিলারেট এনার্জি জানিয়েছে, তাদের ভাসমান সংরক্ষণ ও গ্যাসে রূপান্তর ইউনিট থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় এলএনজি গ্যাসে রূপান্তর করা সম্ভব হবে। এর ফলে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, আবাসিক গ্রাহকসহ বড় পরিমাণে গ্যাস ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির আশা তৈরি হয়।
পেট্রোবাংলার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ইউনিটটির কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল। পরে ৬ আগস্ট থেকে এটি সীমিত পরিসরে আবার চালু হয়। তবে দুর্ঘটনায় হওয়া ক্ষয়ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পরে স্বল্প সময়ের জন্য কার্যক্রম আবারও বন্ধ রাখতে হয়। এখন সেটি পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করার অবস্থায় ফিরেছে।
এর ফলে দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও গ্যাসে রূপান্তর টার্মিনালই বর্তমানে কার্যকর রয়েছে। দুটি টার্মিনাল মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি গ্যাসে রূপান্তরের সক্ষমতা রয়েছে। কাগজে-কলমে এটি গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তির খবর। কিন্তু বাস্তবে সেই সক্ষমতা কাজে লাগানোর জন্য পর্যাপ্ত এলএনজি কার্গো নিশ্চিত করাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
টার্মিনাল আছে, এলএনজি কার্গো নেই
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হঠাৎ করে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে গ্যাসে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় এলএনজি কার্গো জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে চুক্তি পাওয়া সরবরাহকারীদের কাছ থেকে এলএনজি কার্গো পাওয়ার ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলাকে নানা ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
এরই মধ্যে সৌদি আরামকোর এলএনজি কার্গো নিয়ে একটি জটিলতা তৈরি হয়েছে। আল হামরা নামের জাহাজটি গত ১২ আগস্ট বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করলেও এখনো উত্তাল সমুদ্রে আটকে রয়েছে। সমুদ্রের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে টার্মিনাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের আপত্তির কারণে জাহাজটি এখনো টার্মিনালে ভিড়তে পারেনি।
১৯৯৭ সালে নির্মিত জাহাজটির ধারণক্ষমতা প্রায় ৭২ হাজার ৯৯০ মেট্রিক টন। এতে প্রায় ৩ দশমিক ৩৬ মিলিয়ন ব্রিটিশ তাপীয় একক এলএনজি রয়েছে। সৌদি আরামকোর এলএনজি বাণিজ্যিক শাখা আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর এই কার্গো পাঠিয়েছে। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে চুক্তি পাওয়ার পর তারা কার্গোটি সরবরাহ করছে।
কিন্তু সমস্যা শুধু এই একটি কার্গোতেই সীমাবদ্ধ নয়। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে মোট ছয়টি এলএনজি কার্গো সরবরাহের চুক্তি পাওয়া আরও তিনটি প্রতিষ্ঠানও পেট্রোবাংলার সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ঠিকভাবে রাখছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই তিন প্রতিষ্ঠান হলো ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনাল, ব্ল্যাকলুড ইন্টারন্যাশনাল এবং ঝেনুই শিপিং কোম্পানি। তাদের সরবরাহ করার অনুমোদিত এলএনজির পরিমাণ প্রায় ৩ দশমিক ৩৬ মিলিয়ন ব্রিটিশ তাপীয় একক।
পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তিন সরবরাহকারীর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র একজন এলএনজি বহনকারী জাহাজের নাম জানিয়েছে। অন্য দুই প্রতিষ্ঠান এখনো জাহাজের বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি। অথচ চুক্তি অনুযায়ী তিন প্রতিষ্ঠানকেই আগস্টের মধ্যে একটি করে এলএনজি কার্গো সরবরাহ করতে হবে।
এ কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে কার্গো পাঠানোর ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। তা না হলে টার্মিনাল চালু থাকার পরও পর্যাপ্ত এলএনজি না থাকায় গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব হবে না।
এলএনজি না থাকায় সামিট টার্মিনালও বন্ধ ছিল
কার্গো সংকটের বাস্তব প্রভাব এরই মধ্যে দেখা গেছে। এলএনজি না থাকায় সামিটের এলএনজি টার্মিনাল প্রায় ২৫ ঘণ্টা কার্যক্রমের বাইরে ছিল। ১৩ আগস্ট বিকেল ৫টা থেকে ১৪ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিট পর্যন্ত টার্মিনালটি এলএনজি না পাওয়ায় গ্যাসে রূপান্তরের কাজ চালাতে পারেনি।
গ্যাসের চাহিদা যখন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি এবং শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহের চাপ রয়েছে, তখন একটি টার্মিনালও দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। একই কারণে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, সময়মতো এলএনজি কার্গো নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে আবারও ভাসমান টার্মিনালগুলোকে বসিয়ে রাখতে হতে পারে।
এতে সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়ে উঠছে—দেশের সমস্যা শুধু এলএনজি গ্যাসে রূপান্তর করার অবকাঠামোর সক্ষমতা নয়, বরং সেই অবকাঠামো সচল রাখার মতো নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্ঘটনার প্রভাব এখনো কাটেনি
গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর পেট্রোবাংলাকে অন্তত দুটি এলএনজি কার্গোর সরবরাহ পিছিয়ে দিতে হয়েছিল। কার্গো দুটি সরবরাহের দায়িত্বে ছিল গানভর সিঙ্গাপুর এবং টোটালএনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার। পরে উভয় প্রতিষ্ঠান নতুন সময়সূচি অনুযায়ী এলএনজি সরবরাহে সম্মত হয়েছে।
তবে এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, দেশের এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা সংবেদনশীল। দুটি ভাসমান টার্মিনালের যেকোনো একটিতে সমস্যা দেখা দিলে শুধু গ্যাসে রূপান্তরের সক্ষমতাই কমে যায় না, বরং আগে থেকে পরিকল্পনা করা কার্গো সরবরাহের সময়সূচিও এলোমেলো হয়ে পড়ে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এবং হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের ওপর বিধিনিষেধের কারণে মার্চের শুরু থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহকারী অনেক প্রতিষ্ঠান সরবরাহ বন্ধ রেখে বিশেষ পরিস্থিতির কারণ দেখিয়েছে। ফলে বাংলাদেশকে বিকল্প উৎস থেকে কার্গো সংগ্রহের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।
কিন্তু তাৎক্ষণিক বাজার থেকেও এলএনজি সংগ্রহ সহজ হচ্ছে না। সরবরাহকারীদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দাম চাওয়া এবং একই সময়ে ভাসমান টার্মিনালগুলোর কার্যক্রমে বিঘ্ন—দুই দিক থেকেই পেট্রোবাংলার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
উৎপাদন বেড়েছে, কিন্তু স্থায়ী স্বস্তি এখনো নয়
এর মধ্যেই শনিবারের প্রথম দিক থেকে দেশের সামগ্রিক প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। দুটি ভাসমান টার্মিনাল আবার কার্যক্রমে ফেরায় গ্যাসের সামগ্রিক সরবরাহও বেড়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, রোববার দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট ছিল এলএনজি গ্যাসে রূপান্তর করে পাওয়া গ্যাস। শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বড় গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে এই গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ কম। কারণ টার্মিনাল সচল থাকা মানেই নিরবচ্ছিন্ন এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত হওয়া নয়। টার্মিনালের সক্ষমতার পাশাপাশি প্রয়োজন নিয়মিত কার্গো, নির্ধারিত সময়ে জাহাজের আগমন, নিরাপদভাবে জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ এবং সরবরাহকারীদের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়।
বর্তমান সংকট তাই বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার একটি পুরোনো দুর্বলতাকেই সামনে আনছে। আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়লেও সেই আমদানির সরবরাহ শৃঙ্খলকে যথেষ্ট স্থিতিশীল করা যায়নি। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে কিংবা একটি টার্মিনাল দুর্ঘটনায় পড়লে পুরো গ্যাস ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ে।
এখন পেট্রোবাংলার সামনে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো চুক্তিবদ্ধ সরবরাহকারীদের কাছ থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্গো নিশ্চিত করা। পাশাপাশি সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল, টার্মিনালে ভেড়ানোর নিরাপত্তা এবং সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা নিয়েও আগাম পরিকল্পনা প্রয়োজন।
কারণ দুটি টার্মিনাল পুরো সক্ষমতায় কাজ করার অবস্থায় ফিরে আসা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক খবর। কিন্তু সেই সক্ষমতা যদি এলএনজি কার্গোর অভাবে কাজে লাগানো না যায়, তাহলে অবকাঠামো থাকলেও গ্যাস সংকট থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসা কঠিন হবে।

