দেশের প্রতিটি অঞ্চলে স্থানীয় উৎপাদন, উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ৬ হাজার ‘মাইক্রো ইকোনমিক জোন’ গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আর্কিটেকচার রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এআরডি)। প্রস্তাবটি বাস্তবায়নে সরকারের সঙ্গে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি মডেলে কাজ করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। তবে এটি এখনো একটি বেসরকারি প্রস্তাব, সরকারি অনুমোদিত প্রকল্প নয়। বাংলাদেশের বিদ্যমান পিপিপি কাঠামোয় শিল্প, জোন, কৃষি ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
প্রস্তাবটির ধারণা খুব সহজ একটি এলাকার মানুষ শুধু ওই এলাকার ভোক্তা থাকবেন না, একই সঙ্গে উৎপাদকও হবেন। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য স্থানীয় কোনো উদ্যোক্তার প্রক্রিয়াজাত কারখানায় যাবে, সেই পণ্য আবার এলাকার মানুষ বা অন্য ব্যবসায়ী ব্যবহার করবেন। এর সঙ্গে যুক্ত হবে সংরক্ষণ, প্যাকেজিং, পরিবহন, বিপণন, প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন। অর্থাৎ একটি ছোট এলাকায় এমন একটি অর্থনৈতিক চক্র তৈরি করা, যেখানে স্থানীয়ভাবে তৈরি পণ্যের অর্থমূল্যের বড় অংশ স্থানীয় মানুষের মধ্যেই ঘুরতে থাকে।
গ্রামের বাজার শুধু বিক্রির জায়গা নয়, উৎপাদনের কেন্দ্রও হতে পারে
আজ একজন কৃষক ধান, সবজি, ফল বা দুধ উৎপাদন করলেন। কিন্তু উৎপাদনের পর সংরক্ষণ করতে না পারায় দ্রুত বিক্রি করতে হলো। আবার স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত করার ব্যবস্থা না থাকায় কাঁচা পণ্য চলে গেল অন্য এলাকায়। পরে সেটিই হয়তো প্রক্রিয়াজাত হয়ে বেশি দামে আবার বাজারে ফিরল। এখানে কৃষক উৎপাদক, কিন্তু মূল্য সংযোজনের বড় অংশ অন্য জায়গায় তৈরি হচ্ছে।
এআরডির প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য এই জায়গাটিতেই পরিবর্তন আনা। প্রতিটি মাইক্রো ইকোনমিক জোনে কোল্ড স্টোরেজ, বাতাসনির্ভর সংরক্ষণ ব্যবস্থা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, শুকানোর ইউনিট, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও বিপণন সুবিধা রাখার কথা বলা হয়েছে। ফলে একটি এলাকার কৃষক শুধু কাঁচামাল বিক্রি না করে স্থানীয় উদ্যোক্তার মাধ্যমে পণ্যকে আরও মূল্যবান করে তুলতে পারবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান নীতিতেও গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক শিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের আলাদা সুযোগ রয়েছে। ব্যাংকটির বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির মধ্যে গ্রামীণ এলাকায় কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপনের জন্য তহবিল এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের জন্য পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থা রয়েছে।
৬ হাজার জোন মানে আসলে কত বড় উদ্যোগ?
প্রস্তাবিত ৬ হাজার জোনে যদি গড়ে ১০০ জন করে উদ্যোক্তা যুক্ত হন, তাহলে সরাসরি প্রায় ৬ লাখ উদ্যোক্তা এই ব্যবস্থার অংশ হতে পারেন এআরডির হিসাব এমনই। প্রতিষ্ঠানটির মাঠপর্যায়ের প্রাথমিক জরিপে বিভিন্ন এলাকায় গড়ে প্রায় ২৭০ জন উদ্যোক্তার সম্ভাবনা পাওয়া গেছে বলেও জানানো হয়েছে। তবে ৬ লাখ বা তার বেশি উদ্যোক্তা যুক্ত হওয়ার হিসাবটি এখনো প্রস্তাবদাতার সম্ভাব্য হিসাব, কোনো সরকারি প্রকল্পের অনুমোদিত লক্ষ্য নয়।
এখানেই প্রস্তাবটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি আছে। একটি জোনে শুধু কৃষক থাকবেন না। সেখানে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী, প্যাকেজিং ব্যবসায়ী, কারিগর, পরিবহনকারী, দোকানদার, ডিজাইনার, অনলাইন বিক্রেতা, মেরামতকারী এবং নতুন উদ্যোক্তারাও যুক্ত হতে পারেন। একজনের বর্জ্য বা উপজাত অন্য ব্যবসার কাঁচামাল হতে পারে। ফলে একটি ছোট অর্থনৈতিক এলাকার মধ্যেই সরবরাহ চেইন তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
এ ধরনের ‘ক্লাস্টার’ভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ধারণা বাংলাদেশের জন্য একেবারে নতুনও নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি বছর কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ক্লাস্টারের জন্য আলাদা পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি চালু করেছে। অর্থাৎ ছোট ছোট ব্যবসাকে একসঙ্গে এনে অর্থায়ন ও উৎপাদন বাড়ানোর ধারণাটি ইতোমধ্যে নীতিগতভাবেও গুরুত্ব পাচ্ছে।
আসল বাধা জমি নয়, টাকা ও বাজার
এখন প্রশ্ন হলো ৬ হাজার জোন তৈরি করা গেলেই কি ৬ হাজার স্থানীয় অর্থনীতি দাঁড়িয়ে যাবে?
বাস্তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত অবকাঠামো নয়, অর্থায়ন ও বাজার। একটি কোল্ড স্টোরেজ বানালেই সেটি সফল হবে না, যদি সারা বছর পর্যাপ্ত পণ্য না আসে। আবার একটি খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা বানিয়ে লাভ হবে না, যদি উৎপাদিত পণ্যের ক্রেতা না থাকে। উদ্যোক্তাকে ঋণ দেওয়া হলেও যদি সুদের হার বেশি হয় বা জামানতের সমস্যা থাকে, তাহলে প্রকল্পের বড় অংশ কাগজেই থেকে যেতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন ও ঋণ কর্মসূচি ইতোমধ্যেই রয়েছে। ২০২৬ সালের জুনেও ব্যাংকটি সিএমএসএমই খাতের কার্যকরী মূলধনের জন্য পুনঃঅর্থায়ন তহবিল এবং ক্লাস্টারভিত্তিক অর্থায়নের মতো উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। কিন্তু প্রস্তাবিত ৬ হাজার জোনের জন্য প্রয়োজন হবে এর চেয়ে অনেক বেশি সমন্বিত অর্থায়ন যেখানে ব্যাংকঋণ, বিনিয়োগ, সরকারি সহায়তা এবং বেসরকারি মূলধন একসঙ্গে কাজ করবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে প্রথম কয়েক বছরের ব্যবসায়িক ঝুঁকি কে নেবে। কারণ নতুন জোনে উদ্যোক্তা আসবেন, কিন্তু প্রথম দিন থেকেই তাদের ব্যবসা লাভজনক হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই শুধু জায়গা ও ভবন তৈরি নয়, বাজার তৈরি, পণ্য কেনার নিশ্চয়তা, সরবরাহ চেইন, প্রশিক্ষণ ও সহজ ঋণ সবকিছুকে একই পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে।
‘গ্রিন’ জোন বানালেই কি স্থানীয় অর্থনীতি টেকসই হবে?
এআরডির প্রস্তাবে পরিবেশবান্ধব আবাসন, ছোট আকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এমনকি উইন্ডমিল ও ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎ ব্যবস্থার কথাও রয়েছে। ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে জ্বালানি খরচ সরাসরি যুক্ত। বিশেষ করে খাদ্য সংরক্ষণ, শুকানো ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বিদ্যুৎ সরবরাহ নির্ভরযোগ্য না হলে ব্যবসার খরচ দ্রুত বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সবুজ অর্থায়ন কাঠামোতেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে। ব্যাংকের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ডের আওতায় পরিবেশবান্ধব যন্ত্রপাতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সম্পদ-দক্ষ প্রযুক্তিতে অর্থায়নের ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে এখানে একটি সতর্কতা দরকার। শুধু ‘গ্রিন’ শব্দটি ব্যবহার করলেই কোনো প্রকল্প টেকসই হয়ে যায় না। প্রতিটি জোনে কত বিদ্যুৎ প্রয়োজন, স্থানীয়ভাবে কতটা উৎপাদন সম্ভব, বর্জ্য কোথায় যাবে, পানি কীভাবে ব্যবস্থাপনা হবে এবং বিনিয়োগের টাকা কত বছরে ফেরত আসবে এসবের হিসাব আগে করতে হবে।
সরকারের জন্য সুযোগ, আবার বড় পরীক্ষাও
প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু ক্ষুদ্র ব্যবসা তৈরির প্রকল্প হবে না; স্থানীয় অর্থনীতিকে জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করার একটি মডেল হতে পারে। কিন্তু তার জন্য সরকারি সহায়তা মানেই সরকারি অর্থে সবকিছু বানিয়ে দেওয়া নয়। বরং সরকারকে জমি, অবকাঠামো, নীতিগত অনুমোদন, বিদ্যুৎ-গ্যাস, প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নের কাঠামো সহজ করতে হতে পারে; আর বেসরকারি খাতকে বিনিয়োগ ও পরিচালনার দক্ষতা নিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশে পিপিপির জন্য ইতোমধ্যে আইন, প্রকল্প যাচাই, অর্থায়ন ও দরপত্রের কাঠামো রয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন বিনিয়োগ, শিল্পাঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও পিপিপি-সংক্রান্ত সেবাকে আরও সমন্বিত করার সুযোগ তৈরি করছে। ফলে এমন উদ্যোগ সামনে এলে এর জন্য নীতিগত কাঠামো তৈরির সুযোগ একেবারে নেই বিষয়টি এমন নয়।
কিন্তু ৬ হাজার জোনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে সংখ্যা নয়, প্রতিটি জোনের ব্যবসায়িক সক্ষমতা। ৬ হাজার জায়গায় একই নকশা বসিয়ে দিলেই ৬ হাজার স্থানীয় অর্থনীতি তৈরি হবে না। কোথাও মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ বেশি কার্যকর হতে পারে, কোথাও ফল, কোথাও তাঁত, কোথাও মৃৎশিল্প বা কৃষিযন্ত্র। অর্থাৎ জোনের নকশা স্থানীয় সম্পদ ও বাজারের ওপর নির্ভর করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত এই প্রস্তাবের সাফল্য মাপার সবচেয়ে ভালো উপায় হবে একটি জোনে কত ভবন তৈরি হলো তা নয়; সেখানে কত নতুন ব্যবসা টিকে থাকল, কত মানুষ স্থায়ী আয় পেল, কৃষক তার পণ্যের কত বেশি দাম পেল এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি পণ্যের কতটা বাইরে থেকে আনা কমল।
কারণ একটি এলাকার অর্থনীতি শক্তিশালী করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হয়তো সব সময় সেখানে বড় কারখানা বসানো নয়। কখনো কখনো কৃষকের পণ্যটি নষ্ট হওয়ার আগে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা, একজন তরুণকে ব্যবসা শেখানোর জায়গা, একজন নারী উদ্যোক্তার জন্য ছোট উৎপাদন ইউনিট এবং স্থানীয় পণ্যকে বাজারে পৌঁছে দেওয়ার একটি ভালো ব্যবস্থা এসবই মিলে বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তন তৈরি করতে পারে। ৬ হাজার মাইক্রো ইকোনমিক জোনের প্রস্তাবের আসল পরীক্ষা তাই সংখ্যায় নয়, স্থানীয় মানুষের হাতে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আয়ের কতটা ফিরিয়ে দেওয়া যায় সেখানেই।

