দেশে হৃদরোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের প্রকোপ কমাতে খাদ্যপণ্যে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাটি অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণে বড় একটি পদক্ষেপ নিয়েছে দেশের মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন। ভোজ্যতেল, বনস্পতি, লাচ্চা সেমাই, ডেকোরেটেড কেক, চিপস ও চানাচুরের মতো জনপ্রিয় খাদ্যপণ্যে এখন থেকে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ সর্বোচ্চ ২ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে বলে নতুন মান নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি।
আজ সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে জাতীয় হৃদরোগ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত এক অংশীজন পরামর্শ সভায় এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভা শেষে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়েছে। সভার মূল লক্ষ্য ছিল দেশে ট্রান্স ফ্যাটমুক্ত ভোজ্যতেল ও আংশিক হাইড্রোজেনেটেড তেল উৎপাদনে উৎসাহ প্রদান।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক। বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নেন জাতীয় হৃদরোগ প্রতিষ্ঠানের একজন অধ্যাপক, আর রিসোর্স পারসন হিসেবে বক্তব্য দেন একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। অনুষ্ঠানে দেশের বৃহৎ কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর ভোজ্যতেল উৎপাদন ও পরিশোধন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন, পাশাপাশি অংশ নেয় সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোও।
সভায় অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার গুরুত্ব এবং এ বিষয়ে সরকারের অগ্রাধিকার নিয়ে একটি উপস্থাপনা দেন সংস্থাটির কৃষি ও খাদ্য বিভাগের একজন উপপরিচালক।
মহাপরিচালক তাঁর বক্তব্যে বলেন, ট্রান্স ফ্যাটমুক্ত নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের সক্রিয় সহযোগিতা অপরিহার্য। তিনি জানান, শিল্পখাতের বাস্তব প্রতিবন্ধকতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করেই এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে।
উল্লেখ্য, শিল্পোৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাটি অ্যাসিডকে বিশ্বব্যাপী হৃদরোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের অন্যতম প্রধান ঝুঁকিকারক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল্যায়নেও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে ট্রান্স ফ্যাট সম্পূর্ণ নির্মূলকে অকালমৃত্যু ঠেকানোর একটি কার্যকর ও তুলনামূলক স্বল্প ব্যয়ের উপায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই বাস্তবতা মাথায় রেখে আগেই সরকার একটি নির্দিষ্ট প্রবিধানমালা তৈরি করেছিল, যার লক্ষ্য ছিল খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাটি অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ। সেই প্রবিধানের কার্যকর বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা হিসেবেই এবার বনস্পতি ও নন-ডেইরি ভেজিটেবল ঘির জন্য নির্ধারিত জাতীয় মান সংশোধন করেছে মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটি।
সংশোধিত এই মানে যুক্ত হয়েছে ট্রান্স ফ্যাট নিয়ন্ত্রণের আধুনিক প্রয়োজনীয়তা, যা ভবিষ্যতে ট্রান্স ফ্যাটি অ্যাসিডমুক্ত খাদ্যপণ্য উৎপাদনের পথ সুগম করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে অতি প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে, যার সঙ্গে হৃদরোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের সম্পর্ক নিবিড়। এমন প্রেক্ষাপটে ট্রান্স ফ্যাটের ওপর সুনির্দিষ্ট মান আরোপের এই উদ্যোগকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার দিক থেকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন তাঁরা। তবে নতুন এই মান কতটা কার্যকরভাবে বাজারে প্রতিপালিত হয়, তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থাও একই সঙ্গে জোরদার করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

