চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা কারখানার শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৭ হাজার ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ হাজার ৯০০ টাকা করার প্রস্তাব করেছে নিম্নতম মজুরি বোর্ড। প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হওয়ার আগে শ্রমিক, মালিক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত নেওয়ার জন্য ১৪ আগস্ট গেজেট প্রকাশ করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
প্রস্তাব অনুযায়ী, সবচেয়ে নিচের ষষ্ঠ গ্রেডের একজন শ্রমিক মাসে মোট ১১ হাজার ৯০০ টাকা পাবেন। এর মধ্যে মূল মজুরি ৬ হাজার টাকা, বাড়িভাড়া মূল মজুরির ৫০ শতাংশ বা ৩ হাজার টাকা, চিকিৎসা ভাতা ১ হাজার টাকা, যাতায়াত ভাতা ৬০০ টাকা এবং খাদ্য ভাতা ১ হাজার ৩০০ টাকা। অর্থাৎ ২০২০ সালের নির্ধারিত ৭ হাজার ১০০ টাকার তুলনায় প্রস্তাবিত ন্যূনতম মজুরি বাড়ছে ৪ হাজার ৮০০ টাকা বা প্রায় ৬৮ শতাংশ। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত মজুরি নয়; গেজেট প্রকাশের পর ১৪ দিনের মধ্যে আপত্তি ও সুপারিশ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
নতুন প্রস্তাবে শ্রমিকদের ছয়টি গ্রেড রাখা হয়েছে। ষষ্ঠ গ্রেডে ১১ হাজার ৯০০ টাকা থেকে শুরু করে পঞ্চম গ্রেডে ১৩ হাজার ৮৫ টাকা, চতুর্থ গ্রেডে ১৪ হাজার ৪০৫ টাকা, তৃতীয় গ্রেডে ১৫ হাজার ৮৭৫ টাকা, দ্বিতীয় গ্রেডে ১৭ হাজার ৯৪৫ টাকা এবং প্রথম গ্রেডে ২৩ হাজার ২৫৫ টাকা ন্যূনতম মাসিক মজুরির প্রস্তাব করা হয়েছে। শিক্ষানবিশ শ্রমিকের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে মাসে ১০ হাজার টাকা।
কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও আলাদা কাঠামো রাখা হয়েছে। চতুর্থ গ্রেডে ন্যূনতম ১৪ হাজার ৪০৫ টাকা থেকে শুরু করে তৃতীয় গ্রেডে ১৬ হাজার ২৩৫ টাকা, দ্বিতীয় গ্রেডে ১৮ হাজার ৮১৫ টাকা এবং প্রথম গ্রেডে ২০ হাজার ৬০০ টাকা করার প্রস্তাব এসেছে। শিক্ষানবিশ কর্মচারীর ক্ষেত্রেও ১০ হাজার টাকা মাসিক মজুরির প্রস্তাব রয়েছে। ফলে বিষয়টি শুধু সর্বনিম্ন মজুরি বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পুরো বেতন কাঠামোই নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ২০২০ সালে চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা খাতে সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণের সময় ষষ্ঠ গ্রেডের শ্রমিকের মূল মজুরি ছিল ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং মোট মজুরি ৭ হাজার ১০০ টাকা। সেই কাঠামোয় বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে মূল মজুরি বাড়ানোর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল। এবার প্রস্তাবিত ১১ হাজার ৯০০ টাকার মধ্যে মূল মজুরি ৬ হাজার টাকা হওয়ায় শুধু মোট বেতন নয়, মজুরির মূল অংশও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। নিম্নতম মজুরি বোর্ডের এই সুপারিশের ক্ষেত্রে শ্রম আইন অনুযায়ী জীবনযাত্রার ব্যয়, জীবনযাত্রার মান, উৎপাদন ব্যয়, উৎপাদনশীলতা, পণ্যের দাম ও শিল্পের সক্ষমতার মতো বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার কথা রয়েছে।
২০২০ সালের পর থেকে শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয়, খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির বাস্তবতা বদলেছে। ফলে পাঁচ বছর আগের ৭ হাজার ১০০ টাকার মজুরি দিয়ে একজন শ্রমিকের বর্তমান ব্যয় মেটানো কতটা সম্ভব সেটিই নতুন মজুরি কাঠামোর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। একই সময়ে চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতগুলোর একটি। তাই শ্রমিকের আয় বাড়ানোর সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার বিষয়টিও সরাসরি জড়িত।
এই কারণেই প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে এর প্রভাব শুধু শ্রমিকের মাসিক আয়ে সীমিত থাকবে না। কারখানার শ্রম ব্যয় বাড়বে, আর সেটি উৎপাদন খরচের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে দক্ষ শ্রমিক ধরে রাখা, শ্রমিকের জীবনমান উন্নত করা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে শ্রমমান ও কর্মপরিবেশের মান বজায় রাখার ক্ষেত্রেও মজুরি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় শ্রমিকের অধিকার ও ন্যায্য মজুরি নিয়ে ক্রেতাদের নজর বাড়ায়, ফলে কম মজুরির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতা ধরে রাখাও সহজ নয়।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গেজেটে প্রস্তাব প্রকাশিত হয়েছে মানেই নতুন মজুরি কার্যকর হয়ে গেছে এমন নয়। শ্রম আইন অনুযায়ী নিম্নতম মজুরি বোর্ড সুপারিশ করার পর সরকার গেজেটের মাধ্যমে তা ঘোষণা করলে সেটি কার্যকর ন্যূনতম মজুরিতে পরিণত হয়। তাই ১১ হাজার ৯০০ টাকা আপাতত প্রস্তাবিত হার। ১৪ দিনের মতামত ও আপত্তির প্রক্রিয়া শেষে কাঠামোয় পরিবর্তন আসতে পারে।
আর শেষ পর্যন্ত নতুন মজুরি নির্ধারিত হলেও আসল চ্যালেঞ্জ হবে বাস্তবায়ন। কারণ বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্পে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ এবং বাস্তবে তা পরিশোধ দুটি সবসময় একই বিষয় নয়। চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা খাতেও বড় কারখানার পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি কারখানা রয়েছে। নতুন মজুরি কার্যকর হলে এসব প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের প্রকৃত বেতন কাঠামো কতটা বদলায়, সেটিই শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের সাফল্যের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হবে।

