মাছ উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বড় দেশ। নদী, খাল, বিল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে মাছ আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। আর চাষের মাছ উৎপাদনে দেশটির অবস্থান পঞ্চম। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০২৬ সালের জুনের প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
দেশের মাছ উৎপাদন এখন ৫০ লাখ টনের বেশি। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, বছরে দেশের মানুষের মাছের চাহিদা প্রায় ৪৮ লাখ ৯৩ হাজার টন। অর্থাৎ মোট উৎপাদন চাহিদার চেয়েও বেশি।
তারপরও প্রতি বছর বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ মাছ আমদানি করছে বাংলাদেশ। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—দেশে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মাছ উৎপাদন হওয়ার পরও আমদানির প্রয়োজন হচ্ছে কেন?
সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও আমদানিকারকেরা বলছেন, এর প্রধান কারণ মাছের বৈচিত্র্য। দেশের বাজারে চাহিদা থাকা সব ধরনের মাছ পর্যাপ্ত পরিমাণে দেশে উৎপাদিত হয় না। কিছু মাছের স্থানীয় উৎপাদন একেবারেই নেই। আবার হোটেল-রেস্তোরাঁ, প্রক্রিয়াজাতকারী শিল্প ও বিশেষায়িত বাজারের চাহিদাও আমদানির অন্যতম কারণ।
বছরে হাজার হাজার টন মাছ আমদানি
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, বর্তমানে দেশে মাছ ও মাছজাত পণ্য আমদানির জন্য নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ২৮৮টি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৫৬ হাজার টন মাছ আমদানি করেছে। এর পেছনে ব্যয় হয়েছে ৫২১ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫ সালে আমদানি হয়েছিল ৫৫ হাজার টন, যার মূল্য ছিল ৪৭৫ কোটি টাকা।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ৭১ হাজার টন, মূল্য ৬৬০ কোটি টাকা। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৭ হাজার টন মাছ আমদানি করতে ব্যয় হয়েছিল ৪০৬ কোটি টাকা।
আমদানি করা মাছের তালিকায় রয়েছে রুই, পাঙাশ, রূপচাঁদা, টুনা, শ্যাড, মুলেট, দোরাব, ম্যাকারেলসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ। শুকনা মাছের মধ্যে লইট্টা ও পুঁটিও আমদানি করা হয়।
আমদানি করা মাছের বড় অংশই হিমায়িত অবস্থায় দেশে আসে। গত অর্থবছরে মোট আমদানির ৮৬ শতাংশ ছিল হিমায়িত মাছ। এসব মাছ সাধারণত মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে সংরক্ষণ করা হয়। বাকি মাছ আসে শীতল বা বরফে রাখা অবস্থায়, যেখানে তাপমাত্রা সাধারণত শূন্য থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে।
বাংলাদেশের প্রধান মাছ সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, ভারত, মিয়ানমার, জাপান, ওমান, পাকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ড।
কম দামের মাছেরও চাহিদা আছে
আমদানিকারকদের কেউ কেউ বলছেন, দেশের বাজারে এমন কিছু মাছের চাহিদা রয়েছে, যেগুলো স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায় না। আবার কিছু আমদানি করা মাছ তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হওয়ায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের মধ্যেও সেগুলোর চাহিদা রয়েছে।
একজন আমদানিকারক বিভিন্ন দেশ থেকে রুই, ইলিশ, কাতলা, ভারতীয় ম্যাকারেল, ঘোড়া ম্যাকারেল, টুনা, ক্যাটফিশসহ বিভিন্ন মাছ আনেন। তাঁর মতে, আমদানি করা মাছের একটি অংশ দেশের বাজারে বিদ্যমান সরবরাহের ঘাটতি পূরণ করছে।
আরেক আমদানিকারক ভারত ও মিয়ানমার থেকে রুই, কাতলা, ভেটকি ও ইলিশ আনেন। ঢাকার বিভিন্ন বাজারে এসব মাছের চাহিদা স্থায়ী হওয়ায় আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে বলে তিনি জানান।
বিলাসবহুল হোটেলেও আমদানি করা মাছের নির্ভরতা
দেশের সাধারণ বাজারের পাশাপাশি বড় হোটেল ও রেস্তোরাঁতেও আমদানি করা মাছের চাহিদা রয়েছে।
ঢাকার কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানের হোটেল ও সামুদ্রিক খাবারের রেস্তোরাঁর খাবারের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, স্যামন, টুনা, চিলির সামুদ্রিক মাছসহ বিভিন্ন বিদেশি মাছের ব্যবহার রয়েছে।
একটি বিলাসবহুল হোটেলের কর্মকর্তা জানান, তাঁদের নিয়মিত চাহিদার মধ্যে রয়েছে শীতল স্যামন, ধোঁয়ায় প্রক্রিয়াজাত স্যামন, টুনা, চিলির সামুদ্রিক মাছ ও পাঙাশের ফিলে। শুধু ওই হোটেলেই প্রতি মাসে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কেজি আমদানি করা মাছ ব্যবহৃত হয়।
ঢাকার আরেকটি পাঁচতারকা হোটেলেও প্রায় একই পরিমাণ আমদানি করা সামুদ্রিক মাছ প্রতি মাসে ব্যবহৃত হয় বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
বাঁচতে নয়, নির্দিষ্ট চাহিদা মেটাতেই আমদানি
মৎস্য অধিদপ্তরের মাছ পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগের কর্মকর্তা মো. বরকতুল আলম বলেন, দেশের মানুষের মাছের চাহিদা পূরণের জন্য বিদেশ থেকে মাছ আমদানির প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ নিজেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মাছ উৎপাদন করে।
তবে নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতির মাছ ও বিশেষ ধরনের মাছজাত পণ্যের চাহিদা মেটাতে আমদানি প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে বাজারের বিভিন্ন অংশ এবং মাছভিত্তিক শিল্পের চাহিদা পূরণেও আমদানি ভূমিকা রাখছে।
আমদানিতে আরও কঠোর নজরদারি চান কর্মকর্তারা
তবে বিদেশ থেকে মাছ আমদানির পরিমাণ ও উৎস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
বরকতুল আলম বলেন, কোন দেশ ও কোন প্রতিষ্ঠান থেকে মাছ আসছে, আমদানির আগে সেসব বিষয়ে যাচাই, স্বাস্থ্য সনদ পরীক্ষা, সীমান্তে ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শন, পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা এবং বাজারে প্রবেশের পর নজরদারি—পুরো প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনা দরকার।
বর্তমানে আমদানি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মূলত অনাপত্তিপত্র দেওয়া ও সীমিত পরিসরে পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু ভোক্তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরো সরবরাহব্যবস্থার ওপর নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার মানদণ্ডের সঙ্গে দেশের নিয়মকানুন সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, মাছ আমদানির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত বৈজ্ঞানিক তথ্য ও ঝুঁকি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে।
দেশে মাছের উৎপাদন বাড়লেও তাই আমদানির প্রয়োজন পুরোপুরি শেষ হচ্ছে না। মূল বিষয়টি উৎপাদনের ঘাটতি নয়; বরং কোন মাছের চাহিদা কতটা, কোথায় উৎপাদন হচ্ছে এবং বাজারে কী ধরনের মাছ প্রয়োজন—এই বৈচিত্র্যের জায়গাতেই আমদানির বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে।

